ফ্রান্সে জি-সেভেন সম্মেলন ফলশূন্য

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৭

তালেব রানা

 

গেল সপ্তাহে ফ্রান্সের বিয়ারিত্স শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-সেভেনের ৪৫তম সম্মেলন। তিন দিনের এই সম্মেলনে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, ইতালি, জাপান ও স্বাগতিক ফ্রান্সের শীর্ষ নেতারা। বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং ক্ষমতাধর দেশের প্রতি বছরের সম্মেলনে চলমান সংকট সমাধানে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়, তেমনি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এবারের সম্মেলনে তেমন কোনো অগ্রগতি বা ফল আসেনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিউ স্টেটসম্যানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখক পল ম্যাসন লিখেছেন, এবারের জি-সেভেন সম্মেলনে বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত এসেছে। এবারের সম্মেলনে অনেক কিছুই ছিল। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রোমাঞ্চের অভাব ছিল না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর প্রতি মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের ‘অতি আবেগীয় চুম্বন’ আলোচনার ঝড় তুলেছে। সম্মেলনের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ‘কমেডি’ নজর এড়ায়নি। দুই নেতা সবার প্রথম আলোচনা করেছেন। ট্রাম্প ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের সঙ্গে বড়ো ধরনের বাণিজ্য চুক্তির আশ্বাস দিয়েছেন। আবার এবারের সম্মেলনে নাটকও দেখা গেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ হাজির হয়েছিলেন ফ্রান্সে। কিন্তু তিন দিনের সম্মেলন শেষে এর সারবত্তা যা এসেছে, তা খুবই সামান্য।

গত বছর কানাডার চার্লিভয়েক্সে সম্মেলন হয় জি-সেভেনের। ওই সম্মেলন শেষে জাস্টিন ট্রুডোর পক্ষ থেকে চার হাজার শব্দের যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণায় ২৮টি বুলেট পয়েন্ট ছিল। সে সময় ঘোষণায় গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূল্যবোধ। মানবাধিকারের প্রতি সম্মান এবং ‘রুলস-বেসড’ আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা প্রসারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এবারের বিয়ারিত্স সম্মেলনে যে যৌথ ঘোষণা এসেছে সেটা মাত্র ২৭৬ শব্দের। সেখানে উল্লেখ করার মতো কোনো বুলেট পয়েন্টই নেই। যৌথ ঘোষণায় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র অথবা রুলস-বেসড’ আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। কারণ এসব বিষয়ে এবারের নেতাদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। এবারের যৌথ ঘোষণায় মুক্ত বাণিজ্যের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে উন্মুক্ত ও ন্যায্য বাণিজ্যের কথা এসেছে। এবারের সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট অর্থমন্ত্রীদের বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা নজরদারি করতে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক দুরবস্থা ঠেকাতে কোনো যৌথ প্রচেষ্টার প্রতিশ্রুতি আসেনি। আমাজনের আগুন নেভানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্ব নেতারা। কিন্তু এক্ষেত্রে যে পরিমাণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে, তা তাত্পর্যপূর্ণ নয় বলে মনে করা হচ্ছে। 

ইরানের বিষয়ে ঘোষণায় বলা হয়েছে, জি-সেভেন নেতারা দুই উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলেছেন। একটি হলো ইরান কখনো পরমাণু শক্তিধর দেশ হবে না এবং অন্যটি হলো ওই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। ইউক্রেন নিয়ে বলা হয়েছে, দৃশ্যমান অগ্রগতির জন্য শিগগিরই ফ্রান্স এবং জার্মানি সম্মেলনের আয়োজন করবে। লিবিয়ায় অস্ত্র বিরতি চুক্তিতে সমর্থন দিয়েছেন বিশ্ব নেতারা। স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক সমাধান জরুরি বলে মত দিয়েছেন। হংকংয়ে সহিংসতা এড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, একই সঙ্গে ১৯৮৪ সালের চীন-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

লেখক ম্যাসন বলেন, বর্তমান সময়ে ইরান, ইউক্রেন, লিবিয়া ও হংকং হলো বিশ্বের ফ্লাশ পয়েন্ট। এসব সংঘাত ও দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে শুধু কিছু কথা এসেছে, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। এর কারণ হলো এখনকার নেতারা নিয়ন্ত্রণহীন এবং ‘আনপ্রেডিক্টেবল’।

হংকংয়ে চীনের রণসজ্জিত যান পাঠানো হবে কি? পাঠানো হলে কী করা হবে? ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি আবারও বহাল হবে কি? ইউক্রেনের সংঘাত বন্ধের পর স্থিতিশীলতা ফিরবে কি? এবারের সম্মেলনে তার কোনো উত্তর নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় ও মানবিক সংকটের বিষয়ে তেমন কোনো অঙ্গীকারের কথাও আসেনি। যৌথ ঘোষণায় জলবায়ু চুক্তিকে অটুট রেখে কাজ করে যাওয়ার কোনো একটি শব্দ আসেনি। বলা চলে, এবারের জি-সেভেন সম্মেলন ছিল ‘এলিট’ নেতাদের বিনোদনের মিলনস্থল! তাই হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান আগামী জি-সেভেন সম্মেলন মিয়ামির কাছে তার গালফ রিসোর্টে হোক।

২০০৮ থেকে ২০১১ সালের অর্থনৈতিক মন্দা ও সংঘাতের পরিস্থিতিতে বারাক ওবামা এবং গর্ডন ব্রাউন অনেক ভালো কিছু বলেছিলেন বলে মনে হয় না। কিন্তু তারা ওই সময়ে অন্তত আনুষ্ঠানিকতার জন্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কাজ করতে জোর দিয়েছিলেন।