সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও কালোবাজারি নিয়া প্রচুর সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে বিভিন্ন পত্রিকায়। বিশেষ করিয়া তৈরি পোশাক শিল্পে এটি প্রকট আকার ধারণ করিয়াছে। দেশীয় রপ্তানি খাতকে বেগবান করিতে একটি সরকারি ইতিবাচক পদক্ষেপকে ব্যবহার করিয়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রচুর অর্থ হাতাইয়া লইতেছেন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১৯৬৯ সালের কাস্টমস আইনের আওতায় রপ্তানিমুখী খাতকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ বা বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়। এতে কোনো শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাইয়াছে দেশের রপ্তানি খাত। শর্ত একটাই যে, কাঁচামালে তৈরি পণ্য শতভাগ রপ্তানি করিতে হইবে। এই সুবিধার সবচেয়ে বড়ো উপকারভোগী তৈরি পোশাক খাত। সম্প্রতি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় পণ্য আনিয়া কালোবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত ৬৬টি গার্মেন্টস কারখানাকে চিহ্নিত করিয়াছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন অফিসের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য উদ্ঘাটন করা হইয়াছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি কালোবাজারে বন্ড সুবিধার পণ্য বিক্রির সময় হাতেনাতে ধরা পড়িয়াছে। এইসব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানা ছাড়াও কারো কারো আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত করিয়াছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। তালিকায় অভিযুক্ত গার্মেন্টগুলির মধ্যে সুপরিচিতি প্রতিষ্ঠানও রহিয়াছে। অথচ রপ্তানির বিকাশে এই সুবিধা চালু করিতে গিয়া সরকারকে বছরে সর্বমোট ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিতে হইতেছে। এই সুবিধার অপব্যবহার করিয়া এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা বছরে যে পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দিতেছেন তাহার পরিমাণ হইবে ৫২ হাজার কোটি টাকা।
বন্ডে কাঁচামাল আনিয়া কালোবাজারে বিক্রয় হইতেছে, তাহা বন্ধে কোনো পদক্ষেপই যে কার্যকর হইতেছে না, এমন নহে। তবে কতগুলি কারণে ইহা ফেলানো যাইতেছে না। প্রথমত, পোশাক খাতে কাপড়সহ কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করিতে হইবে তাহার প্রকৃত হিসাব নাই বন্ড কমিশনারেটের কাছে। কী পরিমাণ কাঁচামাল লাগিবে তাহা নির্ধারণ করিয়া ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) দিবে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ। কিন্তু প্রদত্ত তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা নেই বন্ড কমিশনারেটের। ফলে রপ্তানির নামে কী পরিমাণ কাপড়, কাগজ বা প্লাস্টিক কাঁচামাল আসিতেছে, সেগুলো কারখানায় আদৌ ব্যবহার হইতেছে কি না, খোলা বাজারে কী পরিমাণ যাইতেছে তাহার সঠিক তথ্য কারো নিকট নাই। দ্বিতীয়ত, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অভাবে বন্ডে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ সঠিকভাবে নেওয়া সম্ভব হইতেছে না। এনবিআরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অভিযানে পণ্যের কিছু চালান ধরা পড়িলেও বন্ড দুর্নীতির হোতারা আড়ালে থাকিয়া যাইতেছে। তৃতীয়ত, বন্ড দুর্নীতি অসাধু ব্যবসায়ীর একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এই দুর্নীতি করিতে ব্যাংক ও এনবিআরের কোনো না কোনো অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সহযোগিতা করিতেছে। সারাদেশে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৮০৯টি। এইসব প্রতিষ্ঠান দেখাশুনার জন্য মাত্র দুই জন বন্ড কমিশনার রহিয়াছেন। তাই বন্ডে কালোবাজারি অনিয়ম রোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোকবল বাড়াইতে হইবে। বন্ড অটোমেশনের যে উদ্যোগ এনবিআর নিয়াছিল তাহা অতি দ্রুত কার্যকর করিতে হইবে। পাশাপাশি এনবিআরের সক্ষমতাও বাড়াইতে হইবে।
