অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া
চলতি বছর বিশ্ব জুড়ে চলছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বাংলাদেশের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনের মতো দেশেও তীব্র আকার ধারণ করেছে মশকবাহিত ভাইরাসটি। মোট ১০টি দেশের ডেঙ্গু পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে কম। অথচ হইচইয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে।
বিশ্ব জুড়ে ক্রমেই ডেঙ্গুর বিস্তার লাভ করছে। নানা কারণে প্রথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকির মধ্যে আছে। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই ডেঙ্গুর আক্রমণ ঘটেছে, সেই বিবেচনায় সবাই এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ, অন্যদিকে চলতি বছরের একই সময়ে সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাত্, বাংলাদেশের চেয়ে শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ বেশি। অথচ বিশ্ব পরিবেশ সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী পরপর তিনবার সিঙ্গাপুর বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ঢাকা শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তো বসবাসের জন্য অযোগ্য সিটির তালিকায় ঢাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। সিঙ্গাপুরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিশ্বের জন্য মডেল। আর সেখানেই কিনা ডেঙ্গুর প্রকোপ বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। তাহলে বোঝা যায়, অন্য আরো অনেক কিছুই ডেঙ্গুর প্রকোপের পেছনে কাজ করে। এডিস মশা নিধনের জন্য ওষুধ ছিটালেই যে সব সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। মাহাথির মোহাম্মদের দেশ মালয়েশিয়ায়ও এডিশ মশা নিধনের জন্য ওষুধ কম ছিটানো হয়নি; অথচ সেখানেও চলতি বছর ০.১৯% ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে অর্থাত্ বাংলাদেশের চেয়ে শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া যথাক্রমে কম্বোডিয়ায় শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ, ফিলিপাইনে শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ, ভিয়েতনামে শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ, লাওসে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ এবং নিউ কেলিডোনিয়ায় ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ ডেঙ্গুর আক্রমণ ঘটেছে। থাইল্যান্ডে (মোট জনসংখ্যা ৬ কোটি প্লাস) চলতি বছরে লাখো মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে শতাধিক। বাংলাদেশে (মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি প্লাস) এযাবত্ আনুমানিক ৩০ হাজার লোক আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ৫০-৬০ জনের। মালয়েশিয়ায় (মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি প্লাস) লাখো মানুষ আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১০০ জনের, ফিলিপাইনে (মোট জনসংখ্যা ১০ কোটি প্লাস) কয়েক লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে চার শতাধিক মানুষের।
তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যাবে ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর আক্রমণ সবচেয়ে কম। তবে এতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু ডেঙ্গুর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে, কাজেই একে প্রতিরোধ করতে হবে। প্লেগের কথা মানুষ ভুলে গেছে। জল বসন্ত নির্মূল হয়ে গেছে, পোলিও নির্মূল হওয়ার পথে। কলেরা মহামারী বিলুপ্তপ্রায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৮-১৯ সালে ফ্লু মহামারীতে বিশ্বে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গত ১০০ বছরে ফ্লু ভাইরাস বহুবার তাদের বিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু মানুষের সতর্কতার কাছে পরাজয় বরণ করেছে, বিশ্বমহামারী আর ঘটাতে সক্ষম হয়নি।
দেশে অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে, প্রতিটি দলেরই অসংখ্য কর্মিবাহিনী রয়েছে, অনেক দলের পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত কর্মিবাহিনী রয়েছে। তারা তাদের লোকজনকে নির্দেশ দিতে পারে, যাতে প্রতিটি গ্রামে ও মহল্লায় তারা যেন এডিস মশার বংশবিস্তারের স্থানগুলো নির্মূল করে। পারস্পরিক দোষারোপের প্রতিযোগিতা না করে বরং এডিশ মশার বংশবিস্তার বিনাশের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। এতে কেউ বাধা দেবে না, বরং কোনো দল বা গোষ্ঠী বা গ্রুপ কতটা এলাকায় এডিশ মশার বংশবিস্তারের স্থান ধ্বংস করল, তার খতিয়ান দেখে জনগণ তাদের মূল্যায়ন ঠিকই করবে। এটাই হলো জনসমক্ষে দেশপ্রেমের নজির স্থাপন করার উত্তম উপায়। মনে রাখতে হবে, বংশবিস্তার বিনাশের পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, ভেকসিনের পরই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। কেননা, বংশবিস্তার নেই তো এডিশ মশাও নেই, আর এডিশ মশা নেই তো তার কামড়ও নেই, আর ডেঙ্গুও নেই। মাত্র এক দিন উক্ত অভিযান পরিচালনা করলে দেশের সব শহরের ডেঙ্গুর উত্সস্থল ধ্বংস করা সম্ভব বলে মনে করি। সেটাই হবে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ডেঙ্গুও একসময় মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যাবে এবং মানুষ জয়লাভ করবে। ভয়ের কিছু নেই। দোষারোপের কিছু নেই, রাজনীতিরও কিছু নেই।
n লেখক :কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পরিচালক : বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল ও সাবেক পরিচালক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
