ফরহাদ আলী
সম্পর্কের ইতি হবে নাকি চিরস্থায়ী হবে সেটা নিশ্চিত করে একার ওপর নির্ভর করে না। দুজন মিলে তিলে তিলে যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয় তা ভেঙে যাওয়ার পেছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একার দায় থাকে না। দুজনকেই কিছু না কিছু দায় বহন করতে হয়। কারো অপরাধ হয়তো একটু বেশি আবার কারো হয়তো একটু কম কিন্তু দোষ অবশ্যই দুজনের থেকে যায়। এই কথাগুলো যেমন একটি প্রেমের সম্পর্কের জন্য জরুরি তেমনি বন্ধুত্বের সম্পর্কের জন্য জরুরি। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আধিপত্যের যুগে একজন আরেকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব, প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠা যেমন খুব সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমনি এই সম্পর্কের অবসান হতেও খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। যোগাযোগের সহজলভ্যতার এই সময়ে খুব সহজেই যেহেতু একে অন্যের খোঁজখবর রাখা সম্ভব হচ্ছে সেহেতু মানুষে মানুষে বিশ্বাসটা আরো গভীর হতে পারত। কিন্তু প্রশ্ন হলো আদৌ কি সেটা হচ্ছে?
একজন মানুষ যখন শুধু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যায় তখন অন্যের মত ও বিশ্বাসের দাম সে আর দিতে পারে না। ভার্চ্যুয়াল জগতের প্রায় প্রত্যেকটি সম্পর্কেই আত্মকেন্দ্রিকতা থাকে যে কারণে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা যেমন করতে সক্ষম হয় না তেমনি কারো প্রতি অবিশ্বাস জন্মাতেও খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। ফলে দিন শেষে ‘মনের সঙ্গে মন না মিশলে শুধু খাতায় দিস না সই’—মনীষীদের এই চিরন্তন বাক্যটির যথার্থতা প্রমাণ হয়। কারণ, সম্পর্কে বিশ্বাসহীনতা সবার আগে মনের সঙ্গে মন মিশানোর ক্ষেত্রেই অন্তরায় সৃষ্টি করে। আগেই বলেছি এই অবিশ্বাস সৃষ্টির পেছনে মানুষের আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি প্রধানত দায়ী। শুধু শুধু সন্দেহের বশে কাউকে দোষারোপ করা যেমন অন্যায় তেমনি নিজে দোষ করে কট্টরভাবে অস্বীকার করা আরো বড়ো অন্যায়। দুজনের কেউ যদি কোনো বিশেষ কারণেও তৃতীয় কারো সঙ্গে মেশার প্রয়োজন হয় সেটি করতেও ভয়ে থাকতে হয় কারণ অন্যজন কোনো কারণে জানতে পারলে হাজারটা প্রশ্ন আবিষ্কার হয়ে দুজনকে পৃথক করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। কিন্তু প্রত্যেকের উচিত ছিল এ রকম যে-কোনো পরিস্থিতিকালে বিষয়টা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিশদ আলোচনা করা। তাহলে একদিকে বিষয়টি নিয়ে যে অযাচিত অবিশ্বাস দুজনের মধ্যে দানা বেঁধেছিল তা দূর হতো, অপরদিকে তাদের মধ্যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের আবির্ভাব না হয়ে নিজেদের বোঝাপড়াটা আরো শক্তিশালী হতো।
অনেক সময় আমরা সামাজিক পরিস্থিতির মাপকাঠিতে মেপে সঙ্গীর ওপর দোষ চাপাতে দ্বিধা করি না। কারো একটুখানি এদিক-ওদিক হলো কিনা আমরা বলেই দেই যে, সবাই এ রকম করে, তুমিও যে এ রকম কর না তার কি বিশ্বাস আছে? এই কথাটি শুনে সে যদি সত্যি এ রকমটা হয় তাহলে সে তার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য খুব সতর্ক হয় আর যদি সে রকম না হয় তাহলে ভিতরে ভিতরে অনেক বড়ো আঘাত পায় আর নিজেকে নিজেই অনেক ছোটো করে দেখতে থাকে। অনেক সময় নিজের খুব আপন ভাবা সঙ্গীর ওপর থেকেও আস্থা হারিয়ে ফেলে। একটি সম্পর্কের মাঝে কোনো কারণে একে অন্যের প্রতি সন্দেহ কখনোই আসবে না এটি যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি প্রত্যেক সন্দেহই যে সত্যতার ওপর ভিত্তি করে হয় সেটিও বলা যাবে না। অনেক সময় আমাদের মাঝে চরম ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায়, তখন আমাদের আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব অন্যের কাছে কখনোই হার মানতে চায় না, যার ফলে সেই সন্দেহের কারণ খুঁজে সমাধান করতেও আমরা চাই না কেননা এই বিষয়টিকেও আমরা নিজেদের সঙ্গীর কাছে পরাজয় হিসেবে ধরে নেই। আর দিনশেষে এই আত্মকেন্দ্রিক অহংবোধ একটি সুন্দর সম্পর্কের ইতি টানতে বাধ্য করে।
আমাদের প্রত্যেকটা সম্পর্ক গড়ে উঠতে যেমন বিশ্বাসের বিশেষণ আমরা একে অপরকে দিয়ে থাকি, তেমনটা পরবর্তীতে ধরে রেখে সম্পর্ক স্থায়ী করতে যাবতীয় অযাচিত সন্দেহ আর আত্মকেন্দ্রিক অহংবোধের উত্পত্তি কোথা থেকে হচ্ছে সেটা প্রথমত আবিষ্কার করতে হবে। তারপর একে অন্যর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে উদ্ভূত জটিলতা দূর করতে হবে। এজন্য অবশ্য দুজনের ইচ্ছা থাকাটা জরুরি কেননা দুজনের একজনও যদি অনিচ্ছা পোষণ করে তাহলে তো কথা বলাও সম্ভব না এবং সম্পর্ক আবার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনাও সম্ভব না। তাই সম্পর্ক স্থায়ীকরণে নিজেদের ইচ্ছা থাকাটাও সব থেকে বেশি জরুরি। কারণ ইচ্ছা ছাড়া উপায় কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আমাদের প্রত্যেকটি সম্পর্ক মানবিক হোক। মানুষিক প্রশান্তির ছোঁয়া লাগিয়ে এগিয়ে চলার পথকে আরো মসৃণ করে দিক। আমরা আমাদের সম্পর্কের মাঝে আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের অবসান হয়ে একে অন্যের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে শিখি। প্রত্যাশা করি সম্পর্কের সুন্দর ভবিষ্যত্।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
