অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছেন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:০৩

মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ অনেক কর্মকর্তা জড়িয়ে পড়ছেন নানা অনৈতিক কাজে। এসবের মধ্যে আছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীর প্রতি অসদাচরণ, প্রলোভন দেখিয়ে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ। সাধারণত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি)—এমন পদধারী কর্মকর্তাদের  বিরুদ্ধেই এমন অভিযোগ  বেশি আসছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখায়  এসব অভিযোগ করা হয়ে থাকে। এখন টাঙ্গাইলের একজন সাবেক ডিসিসহ শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত চলছে। সর্বশেষ অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে জামালপুরের সাবেক ডিসির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি কমিটি।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলছেন, ‘কিছু কর্মকর্তার অনৈতিক কাজের দায় সমগ্র প্রশাসন বহন করবে না। সতর্কতার সঙ্গে নানা বিচার-বিশ্লেষণ করে মাঠে কর্মকর্তা নিয়োগ       দেওয়া হবে।’ দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা সমগ্র প্রশাসনের চিত্র নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

জানা গেছে, গত ১০ বছরে প্রায় তিন হাজার অভিযোগ এসেছে মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা বিভাগে। এর মধ্যে কিছু অভিযোগ আমলে নিয়ে বিভাগীয় মামলার পর কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অনেককে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে, আবার অনেকেই পেয়ে গেছেন অব্যাহতি। মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুতির বিধান রয়েছে। সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ জামালপুরের জেলা প্রশাসকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে ২ হাজার ৭৮৪ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ রকম প্রায় তিন হাজার অভিযোগ জমা পড়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী এদের মধ্যে ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৬৭ জনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে অর্থাত্ তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া ১২৬ কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড অর্থাত্ মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। আর ২০৩ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে ৪৪টি বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নিয়মানুযায়ী তদন্ত কিংবা মামলা চলাকালীন পদোন্নতি বন্ধ রাখা হয়। এমনকি অপরাধের ধরন অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধিও বন্ধ থাকে ।

সম্প্রতি জামালপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর ও এক নারীর আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় প্রশাসন। এরই মধ্যে তাকে ওএসডি করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। আর এ ঘটনা তদন্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখা) যুগ্মসচিব মুশফিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কয়েক দিন আগে এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘জামালপুরের জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে তাতে মন্ত্রণালয় বিব্রত। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৮ সালে নাটোরের সাবেক জেলা প্রশাসক গোলামুর রহমানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর বার্তা পাঠিয়ে এক নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ওই নারী কর্মকর্তা জনপ্রশাসনে লিখিত অভিযোগ করেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই জেলা প্রশাসককে ওএসডি করা হয়, আর নারী কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তবে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ আনা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।