যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনা দিন দিন বাড়িতেছে। এইসব ঘটনা খুবই নির্মম, নিষ্ঠুর ও লোমহর্ষক। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী টেক্সাসে বন্দুকধারীর হামলায় পাঁচ জন নিহত ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২১ জন আহত হইবার খবর পাওয়া গিয়াছে। পরে পুলিশের গুলিতে হামলাকারী নিহত হয়। গত ৩ আগস্ট এই টেক্সাসেই একই রকম ঘটনায় প্রাণ হারান ২২ জন। এইসব নারকীয় কর্মকাণ্ড ন্যক্কারজনক, নিন্দনীয় ও দুঃখজনক।
আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নির্বিচারে গুলি করিয়া হত্যার বহু ঘটনা রহিয়াছে। ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর ৬৪ বত্সর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত এক হিসাবরক্ষক তাহার হোটেলকক্ষ হইতে লাস ভেগাস কনসার্টে হাজির হওয়া দর্শককে লক্ষ্য করিয়া এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। ইহাতে ৫৮ জন নিহত ও ৫৫০ জন আহত হয়। ইহাই সবচাইতে ভয়াবহ ঘটনা। ২০১৬ সালের ১২ জুন অরল্যান্ডো শহরের একটি গে নাইট ক্লাবের ভিতর একজন বন্দুকধারী গুলি চালাইলে নিহত হন ৪৯ জন । ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কানেকটিকাটে ২০ বত্সর বয়সি এক যুবক নিজের মাকে হত্যার পর স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে গুলি চালাইয়া ২০ জন শিশুসহ ২৬ জনকে হত্যা করে। ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের সাদারল্যান্ড স্প্রিংয়ের এক চার্চে ২৬ বত্সর বয়সি বিমানবাহিনীর সাবেক এক সেনার গুলিতে নিহত হন ২৫ জন। ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শৃঙ্খলাজনিত কারণে ফ্লোরিডার মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাইস্কুল হইতে বহিষ্কৃত ১৯ বত্সরের এক ছাত্র তাহার স্কুলে গুলি চালাইয়া হত্যা করে ১৪ শিক্ষার্থীসহ ১৭ জনকে। আবার এই বত্সর ৩১ মে ভার্জিনিয়ার একটি উপকূলীয় শহরে এক প্রকৌশলী নিজের কর্মস্থলে গুলি চালাইয়া ১২ জনকে হত্যা করে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এইসব নির্বিচারে গুলি করিয়া হত্যার ঘটনার পিছনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী বাগাড়ম্বর দায়ী। তাহার লাগামহীন কথাবার্তায় শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ-ভিত্তিক সহিংসতা বা অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস বৃদ্ধি পাইতেছে। আবার অনেকে এইজন্য আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়াকে দায়ী করিতেছেন; কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে বলিয়াছেন যে, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করিয়া হত্যাকাণ্ড বন্ধের একটা উপায় হইল মানুষের হাতে আরও বেশি অস্ত্র তুলিয়া দেওয়া। তিনি স্কুলে এইসব হামলা কমাইতে শিক্ষকদের হাতে অস্ত্র তুলিয়া দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়াছেন। এই ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতারা স্পষ্টত দ্বিধাবিভক্ত। তবে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ মনে করেন, সীমিত আকারে হইলেও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তাহারা অস্ত্র বিক্রির আগে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহূত সামরিক অস্ত্র নিষেধের পক্ষে; কিন্তু কংগ্রেসের অকার্যকারিতার ফলে এই প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি নাই।
যুক্তরাষ্ট্রে জনবসতির ঘনত্ব কম হইবার কারণে নাগরিকরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগত অস্ত্র রাখেন। তবে মোদ্দাকথা হইল, মার্কিন রাজনীতিতে অস্ত্র লবি খুবই শক্তিশালী। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের কথা উঠিলেই ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ) ক্ষিপ্ত হইয়া ওঠে। তাহাদের প্রচারের কারণেই মার্কিন শাসনতন্ত্রের দ্বিতীয় সংশোধনীতে অস্ত্র বহনের যে অধিকার দেওয়া হইয়াছে, তাহাকে ‘পবিত্র’ বলিয়া ধরিয়া নেওয়া হয়। এই সংশোধনীর ভুল ব্যাখ্যা সত্ত্বেও উভয় দলের কোনো নেতাই এই অধিকারের বিরোধিতা করিবার সাহস পান না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় গান লবি বিরোধী ও শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসিলে এই অবস্থার পরিবর্তন হইতে পারে।
