লাভা মাহমুদা
প্রতিনিয়ত মানুষ দেখছি। তবে পরিপূর্ণ মানুষ দেখি না.... মানুষের আবছায়া দেখি। একই মানুষের ভেতর অনেক রূপ দেখি, অনেক রঙ দেখি। সকালবেলা যাকে নমস্য জ্ঞান করি, দিনশেষে তার প্রতি ভাবনাটা আর তেমন থাকে না। এক মানুষের ভেতর কত মানুষের বাস। মানুষের মনোজগত্টা হয়তো এমনই। প্রকাশ্যে এত এত মানুষ যেভাবে নীতিবাক্য বর্ষণ করে, তারাই যদি সেই নৈতিকতার কিয়দংশ অভ্যাস করতো তাহলে সমাজ কতটাই না সুন্দর হতো, মানবিক হতো, সুশোভন হতো। এ সমাজে হত্যা, ধর্ষণ, খুন, লুণ্ঠন, গুম, ডাকাতির মতো ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলো ঘটতো না। আবার মানুষে মানুষে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সৌজন্যবোধ, নম্র ব্যবহার, অসহায়ের প্রতি দয়া, ছোটো ছোটো কথা, একটুখানি হাসি, নির্মল চোখে মায়াবি চাহনি...... মনুষ্যত্ব বিকাশে মানুষ যদি ছোটো ছোটো এই বিষয়গুলোর চর্চা করতো তাহলে মানুষে মানুষে আক্রোশের পরিবর্তে সংযমী, সুশৃঙ্খল, চমত্কার এক মানবিক সমাজের সন্ধান পেতাম আমরা। কিন্তু হায় ! এমন সমাজ যে শুধু সৃষ্টিশীল মানুষের মানসপটেই আঁকা হয়ে আছে, শুধু কল্পনার জগেকই আন্দোলিত করে মাত্র। বাস্তবের সঙ্গে তার যোজন যোজন ফারাক। আমরা একজন জেলা প্রশাসক নিয়েই মেতে উঠেছি.....ভাবখানা এমন, এই ঘটনা বুঝি এবারই প্রথম ঘটলো। অথচ সেই পাকিস্তান আমল থেকেই সিএসপি অফিসারদের কেচ্ছাকাহিনী মানুষ জানতো। সেই সময়েই বউ বদলের মতো ঘটনাও ঘটেছে। আরো কত কত রঙ্গরসের কাহিনী লোকমুখে প্রচারিত হয়েছে। যদিও সরকারি চাকরির শৃঙ্খলাবিধিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে নৈতিক স্খলন গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। আগের অফিসারেরা যেমন এ ধরনের অপরাধের বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করেননি, এই সদ্য প্রাক্তন হওয়া ডিসি সাহেবও করেননি। ভেবেছেন.... প্রকৃতির নিয়মে তার সব ক্রিয়াকলাপ স্বাভাবিকভাবেই চলবে। তবে দুর্ভাগ্যের ফেরে আটকে গেছেন তিনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে প্রশাসনের দুই হাজার ৭৪৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর আগেসহ এ নিয়ে সর্বমোট ৪৪০টি বিভাগীয় মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে ৬৭ জন কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড, ১২৬ জন কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড, ২০৩ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আমরা হয়তো কয়েকজনের নাম জেনেছি আর ভাবছি এবার বুঝি সবকিছু ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু ভাবনাটা যত সহজ, বিষয়টা কিন্তু ততই জটিল। কারণ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী চরিত্রগতভাবে মানুষের মনোজাগতিক বৈশিষ্ট্যে যৌন প্রবৃত্তিতে আসক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেসব মানুষ ফ্রয়েডকে অস্বীকার করে নিজের মানসিক স্তরকে সমাজের মূল্যবোধের চাহিদার সঙ্গে পরিপূরক করতে পারবে, তারাই শুধু এই ত্রুটি মুক্ত থাকবে।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা এসব প্রচার প্রকাশ করছে, আদ্যোপান্ত জানাচ্ছে, তারাও মানসিক বিকারগ্রস্ত। এটা এ সমাজের মানুষ, বিশেষ করে কোমলমতি ছেলেমেয়েদের মূল্যবোধ বিকাশে কতটা নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে, তা আমরা এতটুকুও ভেবে দেখছি না। অভিযুক্ত নর ও নারীকে বিচারের আওতায় আনা স্বাভাবিক। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ঘটনার দৃশ্যপট এবং তার স্ত্রী সন্তানের ছবি ছড়িয়েছে, তাকে স্বাভাবিক মনে হয় না। এমন একটি সংবেদনশীল ঘটনায় এমনিতেই সেই পরিবার দুইটি শোকগ্রস্ত, অসুস্থ, নিরাপত্তাহীন। তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ায় এই যাতনা বিপদাপন্ন পরিবার দুইটিকে ঝুঁকির ভেতর ঠেলে দিয়েছে। সেই পরিবারেও নিশ্চয় শিশু আছে, বৃদ্ধ আছে, আছে মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে সবাই হিরো হতে চায়। কিন্তু সবাই একটু নিজের দিকে তাকাই, মনের আয়নায় নিজের অবয়ব দেখি.... সেখানে কি কোনো কালিমা নেই, কোনো বিচ্যুতি নেই ? মন্দ হতে কষ্ট করতে হয় না, কিন্তু ভালো হতে সাধনা অপরিহার্য। মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক বিকাশ, জীবন সম্বন্ধে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক চেতনার উন্মেষ ঘটানো। তাহলেই হয়তোবা পরিপূর্ণ মানুষ দেখবো, আলোকিত মানুষ দেখবো। সেই মানুষের অন্তর্জগত্ থেকে ঠিকরে বের হবে আলোকরশ্মি, যে আলোতে অবগাহন করবে মানসিক বিকলাঙ্গরা, শুদ্ধ হবে সমাজ।
n লেখক : শিক্ষক
