কথায় আছে, লাইফ ইজ নট অ্যা বেড অব রোজেস। জীবন কখনো গোলাপের পাতা বিছানার মতো মধুর নয়। জীবনে থাকে সংগ্রাম, নানা বাধা। পার হতে হয় ঘাত-প্রতিঘাত। একেক ক্ষেত্রে একেকটা মানুষের জীবন-যাপন করার ধরনটাও আলাদা, ফলে সংগ্রামের গল্পেও থাকে ভিন্নতা। সংগ্রাম আছে সবার জীবনেই। সংগ্রামের পথ পাড়ি দেওয়ার পর ধরা দেয় সাফল্য। কিন্তু এই পথ পাড়ি দিতে গিয়েও কেউ কেউ অল্পতে হাল ছেড়ে দেন, থেমে যান। তবে কেউ কেউ থামেন না। যারা থামেন না, কোনো বাধাই তাদের দমাতে পারে না। কারণ, তাদের মনেপ্রাণে থাকে সাফল্যের অদম্য বাসনা, দারুণ স্পৃহা। সেই পথ ধরে মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম, অধ্যবসায়, হার না মানার দৃঢ় সংকল্প ও আত্মবিশ্বাস তাদের এনে দেয় সফলতা। এই সফল মানুষগুলোই আমাদের চোখে হার না মানা মেধাবী, কিংবা আমরা বলি ‘অদম্য মেধাবী’। ৩৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন সবুজ আহম্মেদের গল্প আমরা জেনেছি, যিনি একসময় তো মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা বেতনের গার্মেন্টসকর্মী ছিলেন। ছোট এক ঘরে স্যাঁতসেতে জায়গায় বাস করে অল্প বেতনের চাকরি করেও তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদিন সফল হবেন, এবং হয়েছেন। এমন সবুজ আহম্মেদদের সংখ্যা অসংখ্য, তারা ছড়িয়ে আছেন আমাদের চারপাশেই। গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা কখনো তাদের অল্প কয়েকজনের কিছু গল্প শুনি, কিন্তু বেশিরভাগের গল্পই জানি না। অথচ এই সফলতার গল্পগুলো মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, হয়ে ওঠে অনেকের অনুপ্রেরণা। সবুজ আহম্মেদের সঙ্গে একই বিসিএসে আরও কিছু মানুষ সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়ার জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, যাদের কেউ পড়াশোনার খরচ জুটাচ্ছেন কাগজের ঠোঙ্গা বানিয়ে বিক্রি করে। কেউ ট্রাকের হেল্পার ছিলেন। কেউ কেউ শুধু তিনবেলার খাবার জোটানোর জন্যই লজিং মাস্টার থেকেছেন কারো বাড়িতে। শুধু চাকরির পরীক্ষায় সফলতা নয়, একইধরনের ঘটনা আমরা দেখতে পাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। পরিবারের চরম দারিদ্র্য, অভাব-অনটনকে পিছনে ফেলে খেয়ে না খেয়ে দিনরাত পড়াশোনা করে অনেকে সফল হয়। নিজেকে তৈরি করে প্রকৌশলী, চিকিত্সক, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক বা প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে যুক্ত হওয়ার দৌড়ে। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলেও আমরা অনেক অদম্য মেধাবীর খোঁজ পাই। অভাব নয় শুধু, কখনো তাদেরকে আশপাশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের গঞ্জনাও সইতে হয়েছে। পরিবারকে শুনতে হয়েছে কটু কথা। পরিবার অসচ্ছল, নিজের হাত নেই, পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ পাচ্ছে। চোখে আলো নেই, কিন্তু ব্রেইল সিস্টেমে লেখাপড়া করেই মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করছে। সমাজ সবসময় তাদের সহযোগিতা করে না। এত অভাব, সমাজের নানা অনাচার, কিন্তু মনের জোরের কাছে সব বাধাই পরাজিত। পৃথিবীর সব সফল মানুষরাই জীবনে একসময় দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। শৈশবে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েও বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া কিছু মানুষের গল্প আমরা জানি। যেমন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন প্রথম জীবনে ছিলেন কাঠুরিয়া। অসামান্য মেধা ও কর্তব্যপরায়ণতা দিয়ে তিনি একসময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন। চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং ছিলেন গরিব মুদি দোকানির ছেলে। ফুটবলের তিন কিংবদন্তি খেলোয়াড় পেলে, ম্যারাডোনা, রোনাল্ডো—তিনজনই ছিলেন বস্তির ছেলে। শ্রীলঙ্কার সাবেক ক্রিকেটার জয়সুরিয়ার বাবা ছিলেন একজন জেলে। স্বাধীন নামিবিয়ার প্রেসিডেন্ট শ্যাম নাজোমা একসময় ছিলেন সামান্য নাপিত। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর শৈশবে দরিদ্র ছিলেন। বিশ্বের সেরা সাহিত্যিকদের অন্যতম ম্যাক্সিম গোর্কি কামারশালা ও জুতার দোকানের কর্মী ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি একসময় চা-বিক্রেতা ছিলেন। আমরা যে অদম্য মেধাবীদের গল্প বলছি, সূত্র ধরে বলতে গেলে এটা বিশ্বাস করতে হয় যে, তারাও একদিন সাফল্যের শিখরে যাবেন। আলো ছড়াবেন সমাজে।
