অণুগল্প

‘আমার কবর যেন হয় মুক্ত মাটিতে’

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৩২

 

পাহাড়িপথে তীব্র আলোর ঝলক। উঁচু-নিচু এবড়োথেবড়ো পথ। তার উপর বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে খানিক আগে। পথ হয়ে উঠেছে পিচ্ছিল ও কাদাময়।

ছুটন্ত আলোর সাথে পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলছে তীক্ষ হর্নের আওয়াজ। ধেয়ে আসছে জিপগাড়িটি।

পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন। বিপর্যস্ত তাদের চেহারা। সারা শরীরে কাদামাখা। হর্নের আওয়াজে সাড়া পড়ে গেল তাদের মধ্যে। প্রত্যেকের হাত উঠে এলো। গাড়ি থামানোর সংকেত দিয়ে ব্যাকুল হয়ে হাত নাড়তে লাগল। জিপের গতির কোনো ওঠা-নামা নেই। একইভাবে পেরিয়ে গেল তাদেরকে হর্ন বাজাতে বাজাতে তীব্র গতিতে।

হঠাত্ হার্ড ব্রেক। বেশ খানিকটা দূর এগিয়ে জিপটা থেমে পড়েছে।

পথের পাশে দাঁড়ানো লোকগুলো থমকে যায়। সাগ্রহে তাকিয়ে থাকে থেমে যাওয়া জিপের দিকে।

জিপ ব্যাক গিয়ারে চলতে শুরু করে। পেছাতে পেছাতে এসে দাঁড়ায় ওদের সামনে।

জিপ। এমন একটা পরিবহনেরই প্রত্যাশায় ছিল! ওদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল।

জিপ থেকে লাফিয়ে নামলেন ক্যাপ্টেন ধর। গায়ে তাঁর বিএসএফ-এর উর্দি। ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দৃষ্টি ঘুরে গেল ওদের সবার দিকে। আপাদমস্তক দেখে নিলেন ওদের। প্রত্যেকের সারা শরীর কাদামাটিতে মাখামাখি। চোখগুলো লাল টকটকে। বিধ্বস্ত চেহারা। ওরা একটা লাশ বহন করে এনেছে।

চোস্ত হিন্দিতে ক্যাপ্টেন ধর জিজ্ঞেস করলেন: কে তোমরা? এখানে কী চাও? ঘটনাটা কী? কী হয়েছে?

ওদের কেউ তেমন হিন্দি বলতে পারে না। তবে বুঝতে পারে। ওদের মধ্যে নেতা গোছের একজন আধভাঙা হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি মিশেল দিয়ে জবাব দিল। তার আগে ইঙ্গিত করল সাথে বয়ে আনা লাশটির দিকে। বলল: আমরা সহযোদ্ধা। আমরা বাঙালি। মুক্তিযোদ্ধা। সীমান্তের ওপারেই বিলোনিয়ায় যুদ্ধ করছি। ইনি ইয়ার আহমেদ। বিলোনিয়া যুদ্ধের প্রথম শহীদ। তবে একা শুধু শুধু মরেননি। সাহসের সাথে যুদ্ধ করে পাকবাহিনীর এক ক্যাপ্টেন আর পাঁচজন সৈন্যকে মেরে শহীদ হয়েছেন।

সাথের সহযোদ্ধারা আবেগ ধরে রাখতে পারল না। তারা সমম্বরে বলে উঠল: জয় বাংলা।

জিপ থেকে ক্যাপ্টেন ধরের সঙ্গীরাও নেমে এসেছে। তারা অবাক হয়ে দেখছে জীবনপণ যুদ্ধরত তরুণদের।

দলের নেতা তার কথা শেষ করল: ইয়ার আহমেদের শেষ ইচ্ছা ছিল, আমরা যেন মৃত্যুর পর তাঁর কবর দিই স্বাধীন বাংলার মুক্ত অঞ্চলে। আমরা সহযোদ্ধারা তাঁকে নিয়ে বেরিয়েছি তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে। যুদ্ধের ময়দান থেকে আমরা তাঁর লাশ তুলে নিয়ে এসেছি। তাঁকে নিয়ে আমরা যাব চোত্তাখোলা। এখান থেকে দশ মাইল দূরে।

নেতা একটু থামল। চোখের আকুলতা নিয়ে তাকায় ক্যাপ্টেন ধরের দিকে। গভীর প্রত্যাশা নিয়ে আচমকা বলে উঠল: আপনাদের জিপটাকে কি দেয়া যাবে?

বলেই সংকুচিত হয়ে পড়ল নেতা। আবদারটা অন্যায় হয়ে গেল। বোকা ও অবিবেচকের মতো। এখন যুদ্ধ চলছে। এসময় সামরিক যান কিভাবে ধার দেয়া যায়? এমন অধিকার কি ক্যাপ্টেনের আছে?

ক্যাপ্টেন ধর নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকালেন নেতার দিকে। কোনো কথাই বললেন না। তিনি তাঁর সঙ্গী সিপাহিদের নিয়ে ইয়ার আহমেদের মরদেহের দিকে এগিয়ে গেলেন। রাস্তার পাশেই তাঁকে রাখা হয়েছে।

ক্যাপ্টেন ধর আর তাঁর সঙ্গীরা শহীদ ইয়ার আহমেদের সামনে দাঁড়ালেন। সামরিক কায়দায় দলবদ্ধভাবে তাঁকে স্যালুট দিলেন। ভিনদেশি হয়েও স্বাধীনতাকামী এক অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে তাঁরা দ্বিধা করলেন না।

ক্যাপ্টেন ধর ফিরলেন মুক্তিযোদ্ধা নেতার দিকে। জিজ্ঞেস করলেন: কিন্তু তাঁকে কবর দেয়ার মতো এ মুহূর্তে তোমাদের কাছে কি কোনো মুক্ত ভূমি আছে?

মুক্তিযোদ্ধা নেতার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখেমুখে ফুটে উঠল দৃঢ়তা। ধীরে ধীরে, কিন্তু বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল: হয়তো এই মুহূর্তে তেমন জমি নেই। তবে চিন্তা করবেন না। এটা হবে। তাঁকে করব দেয়ার জন্য প্রয়োজন হলে আমরা যুদ্ধ করে মাটি মুক্ত করে নেব।