বিজনেস গ্র্যাজুয়েট বা টেকনিক্যাল গ্র্যাজুয়েটদের কোনো প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন সময়ে কোনো একটি বিষয়ে কাজ করাকে ইন্টার্নশিপ বলা হয়ে থাকে। ইন্টার্নশিপ হলো পড়ালেখার একটি অন্যতম অংশ। কারণ ইন্টার্নশিপ রিপোর্টে জমা দেওয়ার পরই একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চূড়ান্ত সনদ পেয়ে থাকে। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপ যে বাধ্যতামূলক, তা নয়। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন একেক রকম। এমবিএ প্রোগ্রামে ইন্টার্নশিপ সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকলেও আন্ডার গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে কয়েকটি বিষয়ে ইন্টার্নশিপ মোটামুটি বাধ্যতামূলক। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই সময়ে অনেক চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা শিক্ষানবীশদেরকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ফ্রেশ এই শিক্ষানবীশরা কাজ করছে কার্যকরী ইনপুট হিসেবে। লিখেছেন মাহবুব শরীফ
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই ফ্রেশ শিক্ষানবীশরা কাজ করছে কার্যকরী ইনপুট হিসেবে। অস্থায়ী এই ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে কেউ কেউ স্থায়ী কর্মী হয় তাদের মেধা এবং দক্ষতার মাধ্যমে। ফ্রেশ ইনপুট হিসেবে এই শিক্ষানবীশরা প্রতিষ্ঠানের কাজ কর্ম ভালোভাবে আয়ত্ত্ব করে বলেই এখন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ ব্যাংক বা ফাইনাশিয়াল ইনস্টিটিউট, মিডিয়া, সেলফোন অপারেটর, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে ইন্টার্নশিপকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিপ্রাপ্তদের জন্য ইন্টার্নশিপ প্রকল্প ‘জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ইন্টার্নশিপ’ চালু হয়েছে বেশ কিছুদিন যাবত্। সম্পূর্ণ সরকারি ব্যয়ে বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গৃহীত এ প্রকল্পের আওতায় বছরের ৫০০ জন কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরধারীকে ইন্টার্নশিপ প্রদানের কথা রয়েছে।
ইন্টার্নশিপ বেনিফিট
যারা ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ তারা তো বটেই প্রতিষ্ঠানও সমভাবে উপকৃত হয়। ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ের যথেষ্ট পরিমাণে সুযোগ থাকে। ফলে স্থায়ীভাবে রিক্রুটমেন্টের সময় যারা ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে অংশ নেয় তাদের মধ্য থেকে যারা চাকরির সুযোগ পায় তারা সত্যিকার অর্থে কোম্পানির ভাল-মন্দ সম্পর্কে নতুনদের থেকে অনেক বেশি ধারণা রাখে। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের ইন্টার্নরা প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধি, পলিসি, সর্বোপরি পরিবেশ সম্পর্কে একটা সাম্যক ধারণা ঠিক পেয়ে থাকে। একজন শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের সময় যে বিষয়গুলো মেজর হিসেবে অধ্যায়ন করেছে তার ব্যবহারিক প্রতিফলন হয় ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে। সুতরাং ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে ভালো একটি চাকরি আশা করতেই পারে।
ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে করণীয়
ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকটি ব্যাপারে মনোনিবেশ করতে হয়। আর এ ব্যাপারগুলো ভালোভাবে রপ্ত করতে পারলেই ইন্টার্নশিপকে সফল ধরা যায়।
সুপারভাইজরের সাথে সদ্ভাব রাখা
ইন্টার্নশিপের সময় কোনো একজনের অধীনে বা তত্ত্বাবধানে ইন্টার্নশিপকরতে হয়। তাই যার অধীনে কাজ করতে হবে, তার সাথে সদ্ভাব রাখতে হবে। যেকোনো আইডিয়া শেয়ারিংয়ে সুপারভাইজারের সাথে আলোচনা করা উচিত। এতে করে শিক্ষানবীশ এবং সুপারভাইজারের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়।
কাজে ইতিবাচক হওয়া
যেকোনো কাজের ক্ষেত্রেই ইতিবাচক হওয়াটা জরুরি। একই কথা ইন্টার্নশিপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইন্টার্নশিপে কাজ করতে গিয়ে ইতিবাচক থাকলে প্রতিটি কাজ থেকেই অনেক কিছু শেখা যায়, যা ভবিষ্যত্ জীবনের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী হবে।
জানার চেষ্টা
কোম্পানির প্রতিটি মিটিং, ওয়ার্কশপ, কনফারেন্স বা ইভেন্টে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করা উচিত। এতে করে প্রতিষ্ঠানের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে জানা যায়। একটা মিটিং হতে পারে শিক্ষানবীশের জন্য বোরিং। তারপরেও এই মিটিংই তাকে দিতে পারে নতুন জ্ঞান এবং নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ।
যতটা সম্ভব নিজেকে হাইলাইট করতে হবে
প্রতিটি ইন্টার্নশিপ মূলত একটি নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্ট, সুপারভাইজার এবং শিক্ষানবীশদের চক্রে আবদ্ধ থাকে। এগুলোর বাইরে নিজেকে কোম্পানির মিটিং, অন্য ডিপার্টমেন্টের কর্মীদের সাথে যোগাযোগ এবং কোম্পানির সোস্যাল ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতে হবে। নিজের আইডিয়া যত বেশি অন্যান্যদের সাথে শেয়ার করা যায়, তত বেশি শেখাও যায়।
উদ্যোগী হতে হবে
কোম্পানি সেসব কর্মীদের পছন্দ করে যারা যেকোনো অবস্থাতে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে পারে। সুতরাং নিজেকে প্রমাণ করতে হবে আপনি কোম্পানির জন্য কিছু করতে পারেন। তাই নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে শুরু করুন।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় যা জানা অপরিহার্য
আপনি হয়ত নতুন একটি ক্যারিয়ার শুরু করতে চাইছেন বা বর্তমান প্রতিষ্ঠানেই নতুন কোনো স্থানে যেতে চাইছেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের দিকে তাকাতে হবে সবার আগে। চাকরি ও আপনার মধ্যে সম্পর্ক অনুধাবন করতে হবে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণে নতুনদের চাকরিতে ঢোকার আগে হয়ত এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময় থাকবে না। কিন্তু অভিজ্ঞ মানুষের চাহিদা সব সময়ই থাকে। এ কারণে যারা কিছুটা অভিজ্ঞ বা কয়েকটি স্থান থেকে চাকরির অফার রয়েছে, তাদের জন্য এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মনে করুন, এ মুহূর্তে আপনার হাতে বেশ কয়েকটি চাকরির অফার আছে। এ অবস্থায় আপনি কি যেখানে বেতন সামান্য বেশি, সেখানে জয়েন করবেন, নাকি যেখানে ভবিষ্যত্ উন্নতির সুযোগ বেশি সেখানে জয়েন করবেন? নতুন চাকরিতে ঢোকার আগে এমন ধরনের পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে।
n আপনার বসের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল। অধিকাংশ চাকরিপ্রার্থীই বুঝতে পারেন না যে চাকরিতে তাদের কার্যক্রমের উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে তার বস। আপনি যদি চাকরিতে জয়েন করার আগে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে নেন, সেটা সবচেয়ে ভালো হয়। এর ফলে তা আপনার জব স্যাটিসফেকশনে কাজে আসবে।
n স্যালারি ও বেনিফিটের পূর্ণ বৃত্তান্ত জেনে নিন। আপনার জীবনযাত্রার ব্যয়ের কতটুকু এতে মেটানো সম্ভব হবে তা জেনে নিন। বেতন ছাড়াও যাতায়াত সুবিধা, বাসস্থান, চিকিত্সা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে আগেই খবর নিয়ে নিন। যাতায়াত ইত্যাদি বাবদ কোনো অর্থ কেটে নেওয়া হবে কি না, তাও জেনে নিন।
n চাকরিতে কী কী কাজ করতে হবে সেটার বিস্তারিত জেনে নিন। এ কাজ করা আপনার পক্ষে আগ্রহ উদ্দীপক হবে নাকি কঠিন হবে এ বিষয়ে খবর নিয়ে নিন।
n প্রতিষ্ঠানে আগে থেকে কেমন সংস্কৃতি চলে আসছে তা জেনে নিন। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সম্পর্কে জানার পাশাপাশি তারা সৃজনশীল কাজে কেমন উত্সাহ দেয়, সেটাও জেনে নিন। যদি তারা উত্সাহ দেয়, তাহলে তা প্রাতিষ্ঠানিক নাকি অপ্রাতিষ্ঠানিক তাও জেনে নিন।
n চাকরিতে ভবিষ্যত্ উন্নতির সুযোগ জেনে নিন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিচের পদে নিয়োগ করে তার পর পদোন্নতির মাধ্যমে উপরের পদের শূন্যস্থান পূরণ করে। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার নিচের পদ থেকে পদোন্নতি না দিয়ে উপরের পদগুলোর জন্য আলাদা করেই নিয়োগ দিয়ে থাকে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আপনার উপরের ওঠার বিষয়টি কিন্তু অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
উপরের বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়ার পর আপনার প্রশ্নের উত্তরগুলো আপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সেই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ইতিবাচকভাবেই ভাবুন।
