কাকলীর নিরাপদ খাদ্যের লড়াই

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৪৩

  মাহবুব নাহিদ

 

কোরবানির সময় মানুষকে দেশি এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ খাদ্য খাওয়ানো গরু ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে দৌড়েছেন। তার যেন নিজের ঈদ নেই, সবার মুখে হাসিই তার ঈদের খুশি। নাম তার কাকলী খান। কোরবানিতে যারা শুদ্ধ কৃষি থেকে গরু নিয়েছেন তারা প্রায় সবাই শুদ্ধ কৃষির নিয়মিত ক্রেতা। গরু লালনপালন করেছে শুদ্ধ কৃষির নির্ধারিত কৃষকেরা। চলতি বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষক ও ক্রেতা উভয়ের সুবিধার কথা মাথায় রেখে কাজ করেছেন তিনি। প্রত্যেকটি জায়গায় ছুটে গিয়েছেন নিজেই। কৃষকদের সঙ্গে ক্রেতার সরাসরি সংযোগ করিয়ে দিয়েছেন কাকলী খান। সরাসরি জায়গায় না গিয়ে শুধু কাকলী খানের ওপর বিশ্বাস করেই গরু কিনেছেন ক্রেতারা।

আর তার ওপর বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি হয়েছে আজ থেকে ১১ বছর আগে শুরু করা নিরাপদ খাদ্যের লড়াই। তার নিরাপদ খাদ্য নিয়ে এই পথচলার শুরুতে তিনি তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের দিয়েই নিরাপদ খাবার খাওয়ানো শুরু করেন। তার এই ইচ্ছার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করে পরিবার এগিয়ে আসেন তার সঙ্গে। তার বাড়িতে এই ১১ বছরে কোনো রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার প্রবেশ করতে দেননি তিনি।

বিভিন্ন শাকসবজি ফলমূলে ক্ষতিকর কীটনাশক, সার, পাকানো বা সংরক্ষণের জন্য দেওয়া কেমিক্যাল ইত্যাদির প্রভাবে আমরা প্রতিনিয়ত যেন বিষ খাচ্ছি। এই দুরবস্থা থেকে নিস্তার পেতেই কাকলী খানের শুদ্ধ কৃষি। গ্রামেগঞ্জে মাঠেঘাটে ঘুরে নিরাপদ সবজি-মাছ-ডিম সংগ্রহ করেছেন। মানুষ তাকে সবজিওয়ালি বলেও মন্তব্য করেছেন। সবাই বলেছেন— এই যুদ্ধে তার জয়ী হওয়া সম্ভব না; কিন্তু তার এই শুদ্ধ কৃষির আজ ঢাকার বুকে গ্রিন রোড, ধানমন্ডি ও গুলশানে তিনটি আউটলেট। রাজধানীর গ্রিন রোডে ধানমন্ডি ক্লিনিকের নিচতলায় শুদ্ধ কৃষির বিপণনকেন্দ্র। এখানে প্রতি শুক্র ও মঙ্গলবার হাট বসে। এ ছাড়া গুলশান এবং ধানমন্ডি ইউনিমার্টেও আছে আউটলেট। তার এই নিরাপদ খাদ্যের  লড়াইয়ের সঙ্গে শরিক হয়ে গ ইউনিমার্ট শুদ্ধ কৃষির আউটলেটের জন্য কোনো ভাড়া নিচ্ছে না।

পড়াশোনা করেছেন বাংলা বিষয়ে; কিন্তু তার আপন ফুপু কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তিনি উদ্যোগ হাতে নেন। তার এই ব্যবসার শুরুতে প্রচুর লোকসানের শিকার হতে হয়। পরিবহন খরচসহ নানাবিধ কারণে পড়তে হয়েছে এই লোকসানে। ভর্তুকি অবশ্য এখনো দিতে হয় তবে অনেকটাই কমে এসেছে। আস্তে আস্তে শুদ্ধ কৃষি তথা নিরাপদ খাদ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এসব পণ্য বিভিন্ন জায়গা সংগ্রহ করে আনতে খরচ হয়ে যায় অনেক। এগুলো বিক্রিও করতে হয় অধিক দামে।

নিরাপদ সবজিচাষের জন্য তার কেরানীগঞ্জে রয়েছে নিজস্ব খামার। আলমডাঙ্গার একটি নির্দিষ্ট বাড়ি রয়েছে যেখানে গ্রামের সবাই নিরাপদ খাবার নিয়ে আসে। নিরাপদ সবজি উত্পাদনের জন্য শুদ্ধ কৃষির রয়েছে নিজস্ব কৃষক। শুদ্ধ কৃষিতে নিরাপদ সবজি ছাড়াও পাওয়া যায় দুধ, ডিম, মাছ, দেশীয় হাঁস-মুরগিসহ অনেক কিছু। কোরবানির গরু ও গরুর দুধ সংগ্রহ করা হয় যমুনার চর, কুষ্টিয়া থেকে। শুদ্ধ কৃষির মাছ সংগ্রহ করা হয় যমুনা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, গলাচিপার নদী, লেবুখালী নদী, রাঙ্গামাটির লেক থেকে। শুদ্ধ কৃষির পণ্য সংগ্রহের জন্য দেশের এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। তবুও পরিবারের জন্য তার ভালোবাসার কমতি নেই। এতো ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের জন্য এবং বিশেষ করে তার মেয়ের জন্য সময় খুঁজে বের করেন তিনি। বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি জেলার কৃষকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছেন কাকলী খান।

শুদ্ধ কৃষিতে ক্যানসার ও কিডনি রোগী ও তার স্বজনদের জন্য রয়েছে ২০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ ওপেন নেটওয়ার্ক সোর্সের উদ্যোক্তা কার্যক্রম চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব প্ল্যাটফরম ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনোভেশন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বিভাগের যৌথ আয়োজনে উদ্যোক্তা সম্মাননা ২০১৮ পেয়েছেন কাকলী খান। গ্রামীণ মহিলাদের সাবলম্বী করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এই শুদ্ধ কৃষি।

কাকলী খান স্বপ্ন দেখেন নিরাপদ খাদ্যের জন্য এক দিন পাগল হয়ে উঠবে সারাদেশের মানুষ। নিরাপদ চাষাবাদ   করে কৃষক পাবে তার ন্যায্যমূল্য, কারণ তারা  বাঁচলেই বাঁচবে দেশ। কৃষকরা সরাসরি শুদ্ধ কৃষির কাছে বিক্রি করতে পারায় তারা লাভবান হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাকলী খানের অসীম ভাবনা। তিনি মনে করেন, প্রত্যেকটি মানুষ নিজের তাগিদেই নিরাপদ খাদ্য খেতে চাইবে। ঢাকা শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠবে বিক্রয়কেন্দ্র। সারাদেশেই নিরাপদ খাদ্য বিক্রির জন্য আলাদা বিক্রয়কেন্দ্র       থাকবে— এমনই আশা কাকলী খানের। মানুষকে নিরাপদ খাদ্য  খাইয়ে সুস্থ রাখার এই দারুণ প্রচেষ্টা কাকলী খানকে সবার কাছে বানিয়েছে শুদ্ধ আপা।