যেসব এলাকা আজ হানাদারমুক্ত হয়

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪৬

ইত্তেফাক ডেস্ক

আজ ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা পাক হানাদারমুক্ত হয়। দিবসটি পালনে গ্রহণ করা হয়েছে নানা কর্মসূচি। এ বিষয়ে প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর। 

নেত্রকোনা :১৯৭১ সালের এই দিনে শহরের নাগড়া কৃষি ফার্মে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ লড়াই হয়। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই নেত্রকোনা পাক হানাদার মুক্ত হয়। পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তারা হলেন, আবু খাঁ, আব্দুর রশিদ এবং আব্দুস সাত্তার। আহত হন মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমেদ।  ৬ ডিসেম্বর পাক হানাদাররা বিভিন্ন এলাকা থেকে তাড়া খেয়ে অবশেষে নেত্রকোনা শহরের ময়মনসিংহ সড়কের পাশে কৃষি ফার্মে এসে জমা হয়। এ সময় কোম্পানি কমান্ডার আনোয়ার মাষ্টারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা আবু সিদ্দিক আহমেদ, তার ভাই আবু আক্কাছ আহমেদ ও আশরাফ আলী খান খসরুরসহ মুক্তিযোদ্ধারা চতুর্মুখী আক্রমণ চালায়। উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে পালাতে শুরু করে। সূর্য উঠার সাথে সাথে নেত্রকোনা শত্রুমুক্ত হয়।

দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়):৯ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলা হানাদার  মুক্ত দিবস। ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় বরণ করে ভোর ৬টায় দেবীগঞ্জ থেকে ডোমার হয়ে সৈয়দপুরের দিকে রওয়ানা হয়। দেবীগঞ্জে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানকারী মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ও দেবীগঞ্জ থানা কমিটির সভাপতি মরহুম সফিউল আলমের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধের পুরো সময়টাতে মুজিব বাহিনীর সরকারের আমলে সফিউল আলমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংগঠিত করে।

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ):এই দিনে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হয়। ৮ ডিসেম্বর রাতে মেজর আফসার বাহিনীর যুদ্ধকালীন কমান্ডার আনছার উদ্দিন ও কমান্ডার আব্দুল বারীর নেতৃত্বে গভীর রাতে নওধার হয়ে সুতিয়া নদী পাড় হয়ে সুতিয়া নদীর পাড়ে অবস্থিত ত্রিশাল থানায় মুক্তিযোদ্ধারা হামলা করে। ভোর পর্যন্ত গুলি বিনিময় শেষে রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে এসময় কয়েকজন রাজাকার পালিয়ে যায়। সকালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও তত্কালীন ত্রিশাল থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি জৈমত আলী ৯ ডিসেম্বর সকালে স্থানীয় নজরুল একাডেমী মাঠে প্রথম পতাকা উত্তোলন করে। এ সময় ১০ রাজাকারকে আটক করতে সক্ষম হয় মুক্তিবাহিনী। আনন্দ-উল্লাসের সময় নিজের বুলেটবিদ্ধ হয়ে ফুলবাড়িয়া গিয়াস উদ্দিন নামে এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়।

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) :স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে জামালকান্দি, গোয়ালমারী এবং বাতাকান্দি এলাকায় হয়েছিল প্রচণ্ড যুদ্ধ। দাউদকান্দি ডাকবাংলো ছিল পাকসেনাদের ধর্ষণ ও নির্যাতন কেন্দ্র। ৭ ডিসেম্বর রাতে সীমান্তবর্তী কুমিল্লা বিমান বন্দর এলাকায় অবস্থানরত পাকসেনাদের ঘাঁটির উপর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী হামলা শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর প্রথমত টমছম ব্রিজ এবং পরে টাউন হল এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাগণ স্বাধীন বাংলায় মুক্ত আকাশে পতাকা উড়ায়। মতলব এবং দাউদকান্দির মুক্তিযোদ্ধাগণ টার্গেট করেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আবস্থানরত পাকসেনাদের দিকে। সারাদিন যুদ্ধ শেষে সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ-উল্লাস করতে করতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দাউদকান্দি সদরে প্রবেশ করে। সন্ধ্যালগ্নে দাউদকান্দি সদরে মুক্তিযোদ্ধাগণ উড়ায় স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজ পতাকা।

তিতাস (কুমিল্লা):আজ তিতাস মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা আর মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী দাউদকান্দি থেকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা উড়িয়ে দেয় স্বাধীন বাংলার লাল সবুজ পতাকা। দিবসটি পালন উপলক্ষে তিতাসে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

কুমারখালি (কুষ্টিয়া):একাত্তরের এইদিনে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলা পাকহানাদার মুক্ত হয়। ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সকালে শহরে প্রবেশ করে এবং কুন্ডুপাড়ায় রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করে। রাজাকার কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধের খবর জেলা শহর কুষ্টিয়ায় অবস্থানরত পাকসেনাদের কাছে চলে যায়। তারা দ্রুত কুমারখালিতে এসে ব্রাশ ফায়ারের মাধ্যমে শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় কম এবং অপর্যাপ্ত অস্ত্র থাকায় তারা স্থান ত্যাগ করে। এ সময় পাকবাহিনী ও রাজাকাররা কুমারখালি শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হত্যাযজ্ঞ ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ শুরু করে। ৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা তোসাদ্দেক হোসেন ননী মিয়া শহীদ হন। এছাড়া তাদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হন মুক্তিকামী বীর বাঙালি সামসুজ্জামান স্বপন, সাইফুদ্দিন বিশ্বাস, আব্দুল আজিজ মোল্লা, শাহাদত আলি, কাঞ্চন কুন্ডু, আবু বক্কার সিদ্দিক, আহমেদ আলি বিশ্বাস, আব্দুল গনি খাঁ, সামসুদ্দিন খাঁ, আব্দুল মজিদ ও আশুতোষ বিশ্বাস মঙ্গল। এরপর ৯ ডিসেম্বর পুনরায় মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদেরকে সংগঠিত করে শহরের চারপাশ ঘিরে পাকবাহিনীর ক্যাম্প (বর্তমানে কুমারখালি উপজেলা পরিষদ) আক্রমণ করে। এরপর পাকবাহিনী দ্রুত পালিয়ে যায়। শহর হানাদারমুক্ত হওয়ার পর সর্বস্তরের জনতা এবং মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল বের করে।

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ):১৯৭১ সালে ২৩ মার্চ গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বেলাল আহম্মেদ স্বাধীন বাংলার পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত গফরগাঁও হানাদারমুক্ত ছিল। ১৭ এপ্রিল থেকে হানাদার বাহিনী স্থল ও আকাশপথে আক্রমণ করে ১৯ এপ্রিল গফরগাঁও দখল করে নেয়। এরপর অসংখ্যবার গফরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং অধিকাংশ যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ৫ ডিসেম্বর, মশাখালী স্টেশনের দক্ষিণে শীলা নদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হলে পাকহানাদার বাহিনী পিছনে হটে যখন গফরগাঁও সদরে আশ্রয় নেয় তখন ইকবাল-ই-কামালের নেতৃত্বে কামাল কোম্পানী এবং আফসার বাহিনীর ব্যোম সিরাজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকহানাদার বাহিনীর পিছু ধাওয়া করে গফরগাঁও সদরসহ উপজেলার সমস্ত এলাকা হানাদার মুক্ত করেন। ৯ ডিসেম্বর ভোরের সোনালি সূর্য উদয়ের সাথে সাথে মুক্তির উল্লাসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয় এবং হানাদারমুক্ত হয় গফরগাঁও।     

ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ):পরিকল্পনা অনুযায়ী প্লাটুন কমান্ডার কাজী হাসানুজ্জামান হীরুর গ্রুপ সোনালি ব্যাংক সম্মুখে, হাবিবুর রহমান হলুদের গ্রুপ চরহোসেনপুর নলুয়া পাড়া মসজিদের পাশ থেকে, আব্দুস ছাওার ও মতিউর রহমানের গ্রুপ থানার পেছন থেকে থানা আক্রমণ করেন। পাকহানাদারদের সাথে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনায় ত্রুটির কারণে ভেঙে পড়ে যুদ্ধের চেইন অব কমান্ড। ফলে তাদের যুদ্ধ অভিযান ব্যর্থ হয়। এ সময় সম্মুখযুদ্ধে পাকহানাদার ও রাজাকারদের হাতে প্রাণ দেন সাত মুক্তিযোদ্ধা। এ যুদ্ধে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক, আব্দুল মান্নান, আব্দুল খালেক, দুলাল, মতিউর রহমান, আবু তাহের ও হাতেম আলী। শহীদদের রক্তের বদলা নিতে মুক্তিযোদ্ধারা ৮ ডিসেম্বর পুনরায় সুসংগঠিত হয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। ভয়াবহ আক্রমণের মুখে পাকহানাদাররা ভীত হয়ে গভীর রাতে থানা ছেড়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধ ছাড়াই ৯ ডিসেম্বর ঈশ্বরগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়।

নকলা (শেরপুর): উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ৬নং পাঠাকাটা ইউনিয়নে পলাশকান্দি গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের পাশে ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর সকালে নকলা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে পড়ে রাজাকার বাহিনীর ১১৭ জন সদস্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে, ফলে এখান থেকেই নকলা হানদারমুক্তের সূত্রপাত হয়। আত্মসমর্পণকৃত রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে আব্দুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের এ দলটি ৯ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় নকলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন। ফলে এদিনেই নকলা উপজেলা তত্কালীন নকলা থানাকে পাকহানাদার মুক্ত ঘোষণা করা হয়।

পূর্বধলা (নেত্রকোনা):মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতার যৌথ আক্রমণে পাকহানাদার বাহিনী ৮ ডিসেম্বর রাতে পূর্বধলা থেকে পালিয়ে যায়। পরদিন ৯ ডিসেম্বর সকালে আবারও  ওই পাকহানাদার বাহিনী জারিয়া-ময়মনসিংহ রেলপথে গৌরীপুর থেকে ট্রেনযোগে পূর্বধলায় প্রবেশ করতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণ ও প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এসময় পাক সৈন্যরা পূর্বধলা উপজেলার পাবই রেল সেতুটি মাইন বিস্ফোরণে ধ্বংস করে যায়। ওইদিন নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া পাক সৈন্যরা পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে উপজেলার শ্যামগঞ্জ পশ্চিম বাজারের মুক্তিযোদ্ধা সুধীর বড়ুয়াকে হত্যা করে। পূর্বধলার ওই যুদ্ধই একাত্তরের রণাঙ্গনে নেত্রকোনা জেলার শেষ যুদ্ধ।

সাঁথিয়া (পাবনা): ৮ ডিসেম্বর সাঁথিয়ার সকল মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হয়ে থানা সদর থেকে দুই কি.মি. পশ্চিমে নন্দনপুরে পাকহানাদারদের সাথে চূড়ান্ত মোকাবিলায় অবতীর্ণ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরদিন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে পাকহানাদাররা আবার সাঁথিয়া আক্রমণের উদ্দেশ্য আসতে থাকে। সেদিন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র বাধার মুখে পাকসেনারা আবার পিছু হটে চলে যায়। এ সম্মুখযুদ্ধে একমাত্র মহিলা মুক্তিযোদ্ধ ভানুনেছা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা প্রদান করেছিলেন। পরদিন ৯ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সাঁথিয়া থানা চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশে বিজয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সাঁথিয়া থানাকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা দেন।