এনামুল হক, খুলনা অফিস
খুলনা মহানগরীতে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অনেক জায়গায় নাকে রুমাল চেপেও দুর্গন্ধের হাত থেকে রক্ষা মিলছে না।
নগরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খানজাহান আলী রোড। এই সড়কের একটি গুরত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে পিটিআই মোড়। এই মোড়ের আশপাশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষকে এই মোড় পেরিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। তাছাড়া প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই মোড় অতিক্রম করে দূর-দূরান্তে যাতায়াত করে থাকে। পথচারীরা সেখান দিয়ে চলতে গেলে নাক চেপে ধরে বা রুমাল ধরে কিংবা দমবন্ধ করে দৌঁড়ে পার হয়। কারণ এখানে রয়েছে ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ।
অপরদিকে দিনের বেলায় রাস্তায় মানুষ চলাচলের সময় তাদের সামনেই সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) গাড়ি ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে উত্কট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে ছুটে চলে রাজবাঁধ এলাকার ফাইনাল ডাম্পিং পয়েন্টের দিকে। নগরীতে এ রকম আরো কয়েকটি ‘স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা’ ময়লা স্তূপকরণের স্থান রয়েছে। সেখান থেকেও দিনের বেলা ময়লা-আবর্জনা ডাম্পিং পয়েন্টে নেয়া হয়।
নগরীর বেশ কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে ডাস্টবিনের সামনে ছোট একটি দেওয়াল দেওয়া রয়েছে। তারমধ্যে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। সড়কের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হচ্ছে বর্জ্য। নগরীর খালিশপুর, নতুনবাজার, জিলা স্কুলের সামনে, কদমতলা, পিটিআই মোড়, নিরালাবাজার, খুলনা সিটি ইমেজিং সেন্টারের পাশে, তেঁতুলতলার মোড়ে বর্জ্য পড়ে আছে দুপুর পর্যন্ত। এসব জায়গার বর্জ্য থেকে উত্কট দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ওই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন মানুষ নাকে রুমাল চেপে চলাচল করছেন।
কেসিসি সূত্র জানায়, খুলনা মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টনের মতো বর্জ্য জমা হয়। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগৃহীত হয় বলে নগরীতে এখন আর কোনো ডাস্টবিন চোখে পড়ে না। ময়লা সংগ্রহকারীরা নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে আবর্জনা স্তূপ করে। এই স্থানগুলোকে বলা হয় সেকেন্ডারি ডাম্পিং পয়েন্ট। এখান থেকেই আবর্জনাগুলো সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে নিয়ে ফেলা হয় খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের রাজবাঁধের শেষ ডাম্পিং পয়েন্টে। মেডিক্যাল বর্জ্যও ফেলা হয় এই রাজবাঁধে। বাড়ি বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারী, কেসিসির আবর্জনাবাহী গাড়িচালক ও অন্য সহযোগীরা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো প্রতিরোধক সামগ্রী ব্যবহার করে না।
আলী হোসেন নামের একজন বর্জ্য সংগ্রহকারী বলেন, ‘ স্যার আমাদের নাকে রুমাল দেয়া লাগে না। দুর্গন্ধ এখন সয়ে গেছে।’
নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি উদ্যোগের নবারুণ সংসদ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ নেওয়াজ টিপু। তিনি বলেন, আমরা ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত থাকতে চাই, কিন্তু নিজেরাই ড্রেনে আবর্জনা ছুড়ে ফেলি।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়ক মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, খুলনা মহানগরীর যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে থাকে। সূর্য ওঠার আগে সরানোর কথা থাকলেলও নেয়া হয় দুপুর বেলায়। এতে মারাত্মকভাবে পরিবেশের দূষণ ঘটে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেসিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে জমা করা হয়। সেখান থেকে নিয়ে ফেলা হয় নির্দিষ্ট স্থানে। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের জন্য ১৯৯৮ সালের দিকে খুলনায় বেসরকারি উদ্যোগ যুক্ত হয়। এরা প্রধানত নির্দিষ্ট কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি থেকে গৃহস্থালি আবর্জনা সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা করে। তবে সব ওয়ার্ডে এখনো এই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি।
কেসিসির কনজারভেন্সি বিভাগের প্রধান আনিসুর রহমান বলেন, খুলনা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে অনেক ভালো। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, তবে তা দ্রুতই আমরা কাটিয়ে উঠব। আমরা সেকেন্ডারি ডাম্পিং পয়েন্টগুলো উন্নত করার চেষ্টা করেছি। জায়গার অভাবে সব তৈরি করা যায়নি। নিরালা এলাকায় জায়গা না পাওয়ায় সেখানে ময়লার স্তূপ সড়কের পাশেই জমে উঠছে। ধীরে ধীরে আমরা সব ময়লা-আবর্জনা রাতেই পরিবহন করব। কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, আগে জনগণকে সচেতন হতে হবে। নিজেদের বাড়ির আবর্জনা নিজেরাই পরিস্কার করে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। তা হলে সিটি কর্পোরেশন যথাযথভাবে ময়লা সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে।
