প্রতিদিন গণমাধ্যমে উঠে আসছে শিশু ও নারী ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির খবর। নারী ঘরে-বাইরে, স্কুল-অফিস, গণপরিবহন, পার্ক, হাসপাতাল কোথাও নিরাপদ নয়। সমাজের কোনো শ্রেণির মানুষের হাত থেকেই তারা রেহাই পাচ্ছে না। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ১০ এলাকাসহ দেশের ৬৪ টি জেলার ২০০টি স্থানে একই সঙ্গে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে সমমনা দেড় শতাধিক সংগঠন। সমাবেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ বন্ধ এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে তারা। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), নারীপক্ষ, কর্মজীবী নারী, অ্যাকশন এইড, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, উত্স বাংলাদেশ, কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডসহ ১৬৮টি সংগঠন এই মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশগুলোতে সম্প্রতি দেশে শিশু, নারী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, ধারাবাহিক বিচারহীনতা ও সঠিক সময়ে রায় না পাওয়ায় অপরাধীরা নির্বিঘ্নে বার বার একই ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। বক্তারা এসব ঘটনায় অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
বনানী ৪ নম্বর রোডের সমাবেশে এমজেএফ এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম পাড়ায় পাড়ায় শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করে ধর্ষণ প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অভিভাবক, শিশু সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা, স্কুল-কলেজ এবং পাড়ার তরুণদের সম্মিলিতভাবে এই অপরাধ ঠেকাতে এগিয়ে আসতে হবে।
মিরপুর-১১ নম্বর বাউনিয়া বাঁধ এ-ব্লক সংলগ্ন লালমাটিয়া টেম্পুস্ট্যান্ডে প্রতিবাদ সমাবেশ করে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। ‘রিডিউসিং ভায়োলেন্স এগেইনেস্ট উইমেন অ্যান্ড গার্লস থ্রো এডভান্সিং সোশ্যাল হারমোনি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের দাবি জানানো হয়। সমাবেশে কিশোর-কিশোরী ও নারী-পুরুষসহ প্রায় ১৫০ জন অংশগ্রহণ করেন।
মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে নারী ও শিশু নির্যাতনের চলমান ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করে কর্মজীবী নারী। এতে বক্তারা বলেন, নারীর উপর সহিংসতা নতুন কোনো বিষয় নয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকল বয়সের নারী যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে; ছেলে শিশুরাও বলাত্কার থেকে রেহাই পাচ্ছে না। দেশের প্রতিটি নারী ও শিশু সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মূল কারণ নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ। নারী বিদ্বেষী মানসিকতা, আচরণ ও সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত ছয়মাসে শুধুমাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী শিশু ও নারী ধর্ষণের যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা ভয়াবহ। গত সাত মাসে অর্থাত্ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৫৭২টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে মারা গেছে ২৩ জন, নিহতদের মধ্যে ৩ জন ছেলে। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৮৪ জন শিশুর ওপরে। এদের মধ্যে নিহত হয়েছে এক শিশু। এছাড়া যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৭৫ জন শিশু। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৬৩০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছে।
