মনীষী

বিস্ময়ের আধার

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:৫৯

 

আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাসাহিত্যের এমন এক সম্পদ যাঁর কথা লিখে শেষ করা যায় না। বহুপ্রজতায় তাঁর তুলনীয় মানুষ সমগ্র বাংলাভাষার সাহিত্যিক মহলে তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে কিংবা সামান্য আগে-পরে নেই বললেই চলে। তিনি ছিলেন কবি, শুধুমাত্র কবি নন, সমক্ষমতাসম্পন্ন গল্পকার, অনেকগুলো ভালো কাব্যনাট্য লিখেছিলেন; নভেলাও লিখেছিলেন কয়েকটি। কিন্তু অবিরল লিখেছেন কবিতা বিষয়ক গদ্য। বাংলাভাষার প্রধান কবি ও কথাসাহিত্যিকদের কথা লিখেছেন অবিশ্রাম। খ্যাত স্বল্পখ্যাত বা অখ্যাত লেখকদের সৃষ্টিসার আবিষ্কারে তার তুলনা কই! বাংলা কবিতার তিন দিকপাল রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ সম্পর্কে তাঁর মতো গভীর পঠনপাঠন আর কার আছে! মুখ্য ও গৌণ কবিসাহিত্যিকদের সম্পর্কে অবিরাম ও অবিরল ধারায় আর কে লিখে গেছেন!

সেই কৈশোরোত্তীর্ণ কাল থেকে আবদুল মান্নান সৈয়দের সৃষ্টিকর্ম আস্বাদ করে আসছি। আজ পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখছি তিনি আমার কাছে ছিলেন বিস্ময়ের আধার, তাঁর কবিতা এমন এক বিস্ময়ের সামগ্রী যার স্মৃতি অবিরাম তাড়া করে ফেরে। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭) এমন এক চূড়ায় উত্তীর্ণ করেছিল তাঁকে যে জ্যোত্স্নারৌদ্রের চিকিত্সার (১৯৬৯) কিংবা ও সংবেদন ও জলতরঙ্গর (১৯৭৪) উজ্জ্বলতাও ম্লান করতে পারেনি তাঁকে। পরে একসময় মনে হয়েছিল তাঁর কবিসত্তা বোধ হয় নিঃশেষিত হয়ে এসেছে। পরাবাস্তবের জগত্ কত আর সমৃদ্ধি দেবে তাঁর কবিসত্তাকে! যৌবনে পরাবাস্তবতার যে বস্ফাির ঘটেছিল তাঁর চেতনায় তা বুঝি বার্ধক্যের বাস্তবতায় নেতিয়ে এসেছে। নির্বাচিত কবিতায় (১৯৭৫) নতুনে-পুরানোয় মিলেমিশে নতুনতর কোনো পথে যাত্রা করেনি। কিন্তু কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২)-এ বর্তমানকে ব্যঙ্গ করে লিখলেন ভিন্ন এক পরাবাস্তব কবিতা। পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২) ও পার্ক স্ট্রীটে একরাত্রি (১৯৮৩) হয়ে মাছ সিরিজের (১৯৮৪) আশ্চর্য রাস্তায় আমাদের হাঁটবার পথ দেখালেন তিনি। তাতেও ক্ষান্ত দেননি কবি। তারপর বাঁক ফেরালেন আর এক নিরালা রাস্তায়! মাঝে লিখলেন সনেট নিরীক্ষা আমার সনেট  (১৯৯০), তারপর লিখলেন সকল প্রশংসা তাঁর (১৯৯৩)—যার রয়েছে সম্পূর্ণ এক স্বতন্ত্র ভুবন। হামদস্বভাবের ভিন্ন এক স্বাদের কবিতা সেগুলো। মনে হয়েছিল এ-জগত্ থেকে বুঝি আর ফিরবেন না তিনি! কিন্তু আশ্চর্য, যেন পুনর্জন্ম ঘটেছে তাঁর! লিখলেন নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা (১৯৯৭), এবারে আর এক জগতে নিয়ে গেলেন তিনি আমাদের। বর্ষীয়ান মানুষের জীবনাভিজ্ঞতা আর প্রজ্ঞা এসে ভর করল এই পর্বের কবিতায়। আবার এক নির্বাচিত কবিতা  (২০০২) প্রকাশিত হলো নতুন-পুরোনোর মিশোলে কবিতার এক সংকলন। এরপর প্রকাশিত হলো মাতাল কবিতা পাগল গদ্য (২০০৬), হে বন্ধুর বন্ধু, হে প্রিয়তম  (২০০৬), কবিতার বই  (২০০৭) ইত্যাদি প্রেমময় কবিতার বই। কবিতার অনুবাদেও তাঁর কৃতী অসামান্য যার নির্দশন মাতাল মানচিত্র  (১৯৭০) ও বিদেশী প্রেমের কবিতা (১৯৮৪)। এর মধ্যে মান্নান সৈয়দকে পাওয়া যায় নতুন মাত্রায়, নতুনতর চমকে। এ-ছাড়াও কবিতায়-কবিতায় নাটক লিখলেন, এন্তার নাটক, যার কদর করতে হলে পাঠকেরও প্রয়োজন যোগ্যতার। নাট্যসমগ্র  (২০০৭) যার নির্দশন হয়ে আছে। (অংশ)

লেখকের ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ সর্বসত্তানিমগ্ন সাহিত্যিক’

(পাঠক সমাবেশ, ২০১২) বই থেকে