ভারতের নাগরিকপঞ্জি ও বাংলাদেশের স্বস্তি, উদ্বেগ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১১

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের অহমিয়া পূর্বাঞ্চলে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস, এনআরসি ঘোষণা করা হয়েছে গেল শনিবার ৩১ আগস্ট ২০১৯ তারিখে। গত বছর প্রাথমিক প্রাক্কলনে ৪১ লক্ষাধিক বাদ পড়ার কথা ছিল। এনআরসির আসাম রাজ্যের সমন্বয়ক প্রতীক হাজেরা টুইটারে ঘোষণা দিলেন : এনআরসিতে আসামের ৩ কোটি ১৯ লাখ ২১ হাজার চার জন অন্তর্ভুক্ত হবেন। ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৭ জন এ তালিকায় স্থান পাননি। ঘটনাটি গত কয়েক মাস যাবত্ উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা-গুজবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে বললেও বোধ হয় ভুল হবে না। কারণ ১ কোটি ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ নাকি বিতাড়িত হতে যাচ্ছিলেন।

বাংলাদেশের বৃহত্ ও মহত্ প্রতিবেশী ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় আসাম প্রদেশে নাগরিকপঞ্জি ঘোষণাটি অবশ্যই ঐ দেশের একটি ‘অভ্যন্তরীণ’ বিষয়। উভয় দেশের কর্তৃপক্ষীয় মহল সেরকম ঘোষণাই দিয়েছেন। কিন্তু কূটনৈতিক মহল, সংবাদমাধ্যম, টীকা-টিপ্পনীকারীগণ বিষয়টির নানাবিধ দিকের বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য, বার্তা ও নিবন্ধ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। ঘটনাটি দুই বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর গলার কাঁটা হতে হতে এখন একটা স্বস্তির বাতায়নে প্রবেশ করেছে। তবে এ স্পর্শকাতরতা এখনো বিদ্যমান বিধায় রাজনীতিবিদ মন্ত্রী-মিনিস্টার, নিবন্ধকার, বিশ্লেষক এমনকি কূটনৈতিক বিশ্লেষকগণকে দেশি-বিদেশি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্ররোচনার মুখেও কিছুদিন একটু নীরব থাকার পরামর্শ দেওয়া যেতেই পারে। তবে ৩১ আগস্টের ঘোষণার মাধ্যমে আসামে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৭ ব্যক্তি বাদ পড়ার যে বেঞ্চমার্ক স্থাপিত হয়েছে, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র নিশ্চয় এটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে সম্মান করবেন। অর্থাত্ বাদ পড়াদের সংখ্যা আগামী আপিল প্রক্রিয়ায় শুধুই কমবে, কোনো অবস্থায়ই বাড়বে না। কারণ, সদ্য সমাপ্ত প্রক্রিয়াটি সুপ্রিম কোর্টের তদারকিতে সম্পন্ন হয়েছে।

এনআরসিতে চমক দেওয়া ও দুঃখজনক নাগরিক হিসেবে বাদ পড়ার অনেকগুলো ঘটনা রয়েছে। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১ লাখ গুর্খা লোক বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। গুর্খারা বোধহয় আন্দোলনেও যাচ্ছেন। এও বলা হচ্ছে যে বাদ পড়াদের সিংহভাগই হিন্দুধর্মাবলম্বী। মুসলমানের সংখ্যা কম। আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৭৪-৭৮ সময়কার ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের পরিবারের কয়েকজন ব্যক্তি ভারতীয় নিবন্ধন তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে পরিবারপ্রধান নিবন্ধন পেলেও পরিবারের অন্য কয়েকজন সদস্য বাদ পড়েছেন। আবার পরিবারের কয়েকজন নথিভুক্ত হলেও পরিবার প্রধান বাদ পড়েছেন। অবাক কাণ্ড, সেনাবাহিনীতে কাজ করে অবসর নেওয়া কর্মকর্তা, কর্মরত কয়েকজন সেপাই ও একজন কর্মরত বিচারক এনআরসিভুক্ত হতে পারেননি। কতিপয় বিহার রাজ্যবাসীও বাদ পড়েছেন বলে প্রকাশ পেয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা কাণ্ড, এক ভদ্রলোক ১৯৫১ সনে জনগণনায় অন্তর্ভুক্ত হন অথচ এখন বাদ পড়েছেন। মুসলমান দম্পতি এনআরসিভুক্ত হলেও তাদের সাত বছরের সন্তান অবৈধ নাগরিক হয়ে গেছে।

সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে যে বাদ পড়া ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৭ জনের কেউই এখনই বিদেশি হয়ে পড়ছেন না বা গ্রেপ্তার হয়ে যাচ্ছেন না। ১২০ দিনের মধ্যে সরকারি খরচে তারা বাদ পড়া বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আপিল করতে পারবেন। ওপরে বর্ণিত অসংগতি এবং অন্য দলিলাদি পেশ করে তাদের অনেকেই এনআরসিতে ১২০ দিনের মধ্যেই হয় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন অথব প্রক্রিয়াভুক্ত হবেন। তার পরও সুপ্রিম কোর্টে বাদ পড়া বিষয়ে আবারও আর্জি পেশ করতে পারবেন। অর্থাত্ সবগুলো আর্জি আপত্তি নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। আমরা অনেকের সঙ্গে তাদের সঙ্গে একমত যে, প্রাথমিক আপত্তিটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে না করে বিশেষভাবে গঠিত কোনো বিচারিক আদালতে দায়ের করার সুযোগ দেওয়া হোক। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর মানে তো এক ধরনের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলা। তবে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের যে কয়েক লাখ অমুসলিম লোক এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন তাদের বিষয়ে নাকি তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করা হচ্ছে না। তবে কি কেবল মুসলমানগণই টার্গেট। সেটা কেমন কথা।

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মোড়কে যে ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যুর কথা বলা হয়েছে, প্রকৃত পরিস্থিতি যে তা নয়, সেটিও অন্তত বাংলাদেশের জনগণ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে। ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে-পরে এবং বর্তমানেও শিষ্টাচারবহির্ভূত হুমকিধমকি দুটি দেশের অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ইহার প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখুক, এটাই দুই দেশের জনগণের কাম্য। মনে রাখা ভালো যে, ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবসহ অনেকগুলো আন্তর্জাতিক আইনে একটি দেশে আগত বিদেশি নাগরিকদের জন্য কতিপয় রক্ষাকবচ রয়েছে। আরো একটি কথা সম্পূর্ণ অবান্তর হলেও বলা প্রয়োজন : বাংলাদেশে ১১ লাখ সাধারণত অপরাধপ্রবণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ থেকে মারধর অত্যাচার নির্যাতন করে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটানোর সঙ্গে একাত্তরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যার সম্মুখীন ১ কোটি শরণার্থীকে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে স্বেচ্ছায় আশ্রয় দানের ঘটনাকে কোনো মানদণ্ডেই সমভাবে দেখা যেতে পারে না।

আসামে ‘কোটি’ বাংলাদেশি মুসলিম খেদাও নামে যে সাম্প্রদায়িকতার ঢেউ সৃষ্টি করা হয়েছিল, আশা করি, এনআরসি টুইট বার্তার মাধ্যমে তার অবসান হয়ে সকলের জন্য শান্তিশৃঙ্খলার সঙ্গে বসবাসের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। ক্রোধের বশে পশ্চিম বাংলা, দিল্লি ও অন্যান্য স্থানে এনআরসি অনুষ্ঠানের দাবি কেন্দ্রীয় সরকার নাকচ করে দেবেন বলেই মনে করি।

n  লেখক : অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।