দেশের ভবিষ্যত্ শিশু ও তার মা

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১১

হায়দার আহমদ খান এফসিএ

সময়ের পরিবর্তনে সৃষ্টি হয়েছে দেশ। আর একটি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান যত উন্নত সে দেশকে বলা হয় তত উন্নত। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী কাজ। সে কাজ করে থাকে দেশের মানুষের পক্ষে সরকার। দেশের সব মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমেই উন্নয়নের সফলতা আসে। মানুষ পুরুষ-নারীভেদে সবাইকেই বোঝায়। আর সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের মধ্যে পুরুষ-নারীর অনুপাত প্রায় সমান সমান, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। দেশের সব কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণেই উন্নয়ন সহজ ও সফল হয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন চিত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে আলোচনার জন্য ১৭ কোটিকে হিসাবে নিতে চাই, কারণ সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকায় মতামত কলামে ‘মানুষ বেশি হলে কার লাভ?’ শিরোনামে যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশের জনঘনত্ব নিয়ে তাতে ১৭ কোটি মানুষ হিসাবে দেওয়া হয়েছে। গুগলের সৌজন্যে পাওয়া তথ্যেও বাংলাদেশের ২০১৯ সালের আগস্ট মাসের ২১ তারিখের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬৩ জন  বলা হয়েছে। হিসাবে দেখা যায়, ৪৯.৪২ শতাংশ নারী এবং বাকি ৫০.৫৮ শতাংশ পুরুষ। সুতরাং দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক পুরুষ এবং অর্ধেক নারী বলা যেতেই পারে। সমাজ উন্নয়নে নারী-পুরুষভেদে সমান দায়িত্ব রয়েছে। পুরুষ-নারীনির্বিশেষে যদি একটি পরিবারের বা দেশের মানুষ উপার্জন করতে পারে, তাহলে উন্নয়ন বা সচ্ছলতা সহজ হয়। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এই বিপুল জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার, গরিব ও অশিক্ষিত। সরকারের হিসাবে বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ১,৯০৯.০০ মার্কিন ডলার (সূত্র : ২০/৩/২০১৯, ডেইলি স্টার)। ১৭ কোটির মধ্যে ২১.৮০ শতাংশের অর্থাত্ ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের দৈনিক গড় আয় ১.৯০ মার্কিন ডলারের কম। এই অংশের মানুষের মধ্যে জন্মহার যেমন বেশি তেমনি আবার অশিক্ষার হারও বেশি। আর্থসামাজিক বিবেচনায় বলা যায় একটি আরেকটির পরিপূরক। একই সঙ্গে এখানে বাল্যবিবাহের মাত্রাও বেশি। এমন একটি অবস্থা বিরাজমান আছে বলেই আমাদের যুবতি মেয়েদের একটি অংশ উপার্জনের জন্য বিদেশে পা বাড়াচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশের আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের জন্য দেশের পরিবেশও নিরাপদ নয়। প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়, পশুচরিত্রের কিছু মানুষের হাতে নিগৃহীত হচ্ছে তিন বছরের মেয়েও। একই সঙ্গে উল্লেখ করা যায় সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকের আত্মহত্যা’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয় কলাম। সেখানে দেখা যায় ২০১৬ সাল থেকে গত জুন, ২০১৯ পর্যন্ত ৩১১ নারী শ্রমিকের লাশ বাংলাদেশে আনা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৩ জন আত্মহত্যা করেছেন, ৫৬ জন দুর্ঘটনায় এবং ১২০ জন স্ট্রোকে মারা গেছেন। বিশ্বায়নের যুগে কাজের সন্ধানে বিদেশ যাওয়া এখন কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা। আমাদের যেসব যুবক বিদেশে চাকরি করে তাদেরও অবস্থা তথৈবচ। শ্রমিকের চাকরি নিয়ে যারা বিদেশে যান, তাদের বহুবিধ সমস্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পারিবারিক জীবন না থাকা। এক্ষেত্রে নারী হলে সমস্যা দ্বিগুণ। হয়তো এক পর্যায়ে আত্মহত্যা ছাড়া সমাধানের অন্য কোনো পথ খুঁজে পায় না। টাকার জন্য এক মাস, দুই মাস পরিবার ছেড়ে থাকা যায় কিন্তু বছরের পর বছর থাকা যায় না বা উচিত নয়।

বর্তমান বিশ্বের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে যদি বাংলাদেশের শিক্ষার মান ও হার আন্তর্জাতিক মানের নিশ্চিত করা যেত, তাহলে দেশে-বিদেশে আমাদের সন্তানরা সম্মানের সঙ্গে চাকরি করতে পারত। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিবিদরা চিন্তা শুরু করেছেন Fourth Industrial Revolution নামক পরিবেশকে নিয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকারের আইসিটি ডিভিশনের এক জরিপে দেখা যায়, ২০৪১ সালের মধ্যে ৫৩.৮০ লাখ মানুষ কর্মহীন হবে Fourth Industrial Revolution-এর জন্য। তারমধ্যে আমাদের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে ২৭ লাখের চাকরির সুযোগ কমে যাবে আর সেখানে চাকরি করে অধিকাংশ নারী।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আর্থিক সচ্ছলতা। আমাদের দেশে জাতীয় পর্যায়ে আর্থিকভাবে অনগ্রসর সম্প্রদায়ের আর্থিক অবস্থার উন্নতির দায়িত্ব সরকারের। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদস্যদেশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে সামনে রেখে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ নিয়ে কাজ চলছে। অবশ্য বাংলাদেশের সংবিধানও সরকারের ওপর এ কাজের দায়িত্ব দিয়ে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে। সমাজ বিবর্তনের এই পর্যায়ে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মায়েরা অনেক বেশি সজাগ। এ কারণেই দেখা যায় সমাজের একটি বড়ো অংশের মা তাদের সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ মনে না করে স্কুলের সামনে ফুটপাতে বসে অপেক্ষা করেন ছুটি না হওয়া পর্যন্ত।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। সমাজ উন্নয়নের সব কর্মকাণ্ডে এই নারী সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই উন্নতি টেকসই হবে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বাংলাদেশের শিক্ষার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ক্ষেত্রে শতভাগ শিক্ষিত করার পাশাপাশি মান হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। এমন একটি পরিকল্পনায় বাংলাদেশের নারীদের জন্য থাকতে হবে একটু বেশি দায়িত্বশীল কর্মসূচি। বিশেষ করে, সমাজের অনগ্রসর অংশের নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যসহ সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। মনে রাখতে হবে, সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা মা।

বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য চলছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় অনেক সেক্টরের উন্নয়নের কথা বলা হলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিশু ও নারীদের উন্নয়নের। মনে রাখতে হবে, একটি দেশের ভবিষ্যত্ হচ্ছে শিশু আর শিশুর দায়িত্ব তার মায়ের ওপর। শিক্ষিত মা দায়িত্বশীল হয়ে থাকে এবং এ কারণেই নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি উপহার দেব’। জাতিসংঘও উন্নয়নের জন্য নারীদের বেশি গুরুত্ব দিয়ে ২০১৬ সালে ১৭টি লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। তার পঞ্চম লক্ষ্য Gender Equality। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশীদার। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশ ছোটো, জনসংখ্যা বেশি, প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন নেই। বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত প্রতিযোগিতামূলক হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সমাজের সব মানুষের সমান অংশগ্রহণ। নেপোলিয়ন নারীর ক্ষমতায়নের কথা চিন্তা করেছিলেন আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে। সময়ের চাহিদার বিবেচনায় এবং যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে নারীর সব মেধার ব্যবহারের জন্য সব প্রচেষ্টা নিতে সময় নষ্ট করা আত্মহত্যার শামিল।

n লেখক :চেয়ারম্যান, এডুকেশান ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন—ইডিএ।