পরিত্যক্ত পলিথিন-প্লাস্টিকে জ্বালানি তেল-গ্যাস

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:২১

রোস্তমের অভিনব উদ্ভাবন

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও রাজারহাট সংবাদদাতা

পরিত্যক্ত পলিথিন-প্লাস্টিক আগুনে গলিয়ে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও এলপি গ্যাস তৈরির মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার শিক্ষার্থী রোস্তম আলী। বদ্ধ ড্রামের ভিতর তরল পলিথিন বাষ্পীভূত হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পরিশোধিত হয়ে বোতলে-জেরিকেনে জমছে জ্বালানি তেল-গ্যাস। শুধু জ্বালানিই নয়, অবশিষ্ট পলিথিনের ছাই থেকে ফটোস্ট্যাট মেশিনের কালি তৈরির গবেষণা চালাচ্ছে রোস্তম।

ডিপ্লোমা পাশ করে অনলাইন কোর্সে ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারস বাংলাদেশ (আইইবি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বর্তমানে অধ্যয়নরত। ইতিমধ্যে তার অভিনব উদ্ভাবনী দেখে যে কোনো ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের বালাকান্দি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনেই একটি আবদ্ধ তেলের ড্রামের সঙ্গে পাইপের মাধ্যমে একটি বোতল এবং দুইটি জেরিকেনের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ড্রামের ভেতর প্লাস্টিক ও পলিথিন ভরে মুখ বন্ধ করে তলায় আগুন জ্বালিয়ে তা গলানো হচ্ছে। অভিনব পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল-গ্যাস আবিষ্কার দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় জমাচ্ছে তার বাড়িতে। প্রায় ২৫-৩০ মিনিট ধরে উচ্চতাপ প্রয়োগে গলে বাষ্প আকারে পাইপের মাধ্যমে ফোঁটায় ফোঁটায় বোতল ও জেরিকেনে জমছে ডিজেল-পেট্রোল-অকটেন। জেরিকেনের সঙ্গে অপর একটি পাইপের মাথা দিয়ে বেড়িয়ে আসছে এলপি গ্যাস। রোস্তম আলী পরিত্যক্ত প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে উত্পাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব মোটরসাইকেলে ব্যবহার করার পাশাপাশি গ্রামবাসী, বন্ধুবান্ধবদেরও দিচ্ছেন ব্যবহারের জন্য।

জ্বালানি তেল উদ্ভাবক রোস্তম আলী জানান, ছোটোবেলায় শীত থেকে রক্ষা পেতে গ্রামের মানুষ খড়কুটোর পাশাপাশি পলিথিন পোড়ালে ফোঁটা ফোঁটা আকারে কিছু পদার্থ বের হতো। সেখান থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রায় ৩ বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। ২০১৭ সালে টিনের ছোটো কৌটায় কিছু প্লাস্টিক গলিয়ে তরল পদার্থ বের করে শোধন করার পরীক্ষা চালিয়ে দেখি ডিজেল ও পেট্রোল জাতীয় তরল পদার্থ বের হয়ে আসছে। এভাবেই ছাকন পদ্ধতি এবং থিতানো পদ্ধতিতে শুরু হয় পরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্পাদন। এই পদ্ধতিতে পরিষ্কার এক কেজি পলিথিন বা প্লাস্টিকে ৯০০ গ্রাম তেল এবং অপরিষ্কার পলিথিন থেকে ৬০০-৭০০ গ্রাম জ্বালানি তেল উত্পাদিত হয়। এতে খরচ হয় মাত্র ৩০ টাকা। এই তরল পদার্থগুলো হাইড্রোকার্বন এবং এগুলোর ধর্ম এবং বর্ণ ডিজেল-পেট্রোল-অকটেন এবং নির্গত গ্যাস এলপি গ্যাস। সরকারি বেসরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে দেশের জ্বালানি খরচ নতুন মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি প্লাস্টিকের অপব্যবহারে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

রাজারহাট উপজেলার পান্থাবাড়ী বালাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনেশ্বর চন্দ্র বর্মণ জানান, রোস্তম আমার স্কুলের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। অভাব-অনটনের সংসারে অনেক কষ্ট করে পড়াশুনা করেছে। আমরা ভাবতেই পারিনি সে এমন ব্যতিক্রমী একটা আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দেবে। উচ্চমহলের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরো অনেক দূর এগোবে বলে আমার বিশ্বাস।

রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. রাশেদুল হক প্রধান জানান, আমি নিজেই দেখেছি রোস্তমের আবিষ্কার। দেশে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। তবে রোস্তমের আবিষ্কারটা একটু ব্যতিক্রম মনে হয়েছে আমার কাছে। কেননা সে একই প্লাস্টিক পুড়িয়ে সেখান থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল এবং এলপি গ্যাস উদ্ভাবন করেছে। এই বিষয়ে রোস্তম আলী যে ধরনের সহযোগিতা চাইবে আমি ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই সহযোগিতা দেব।