মাহাতির মোহাম্মদ মুনতাসির হোসেন ২য় শ্রেণিতে পড়ছে। এখনই জানায় বড় হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নের কথা। তার বড়ভাই প্রকৌশলী বলে তার এমনটাই ইচ্ছা। বাবা মোঃ মেজবাহ উদ্দিন জানান, ছেলের উপর কোনো জোর নেই। কথা বলতে পারছে, সাধারণ স্কুলে পড়ছে এটাই তার কাছে অনেক বড়। গত ৪ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ তলার করিডোরে কথা হচ্ছেল তার সাথে। জানান, ছেলের বয়স যখন ১৬ মাস তখন বুঝতে পারেন ছেলে কানে শোনে না। এতদিন সন্দেহ থাকলেও সেদিন বিকট শব্দে সবাই যখন আঁতকে উঠে, তখন মাহাতিরের নির্বিকার থাকা তাদের কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। এই ডাক্তার ঐ হাসপাতাল করে জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশুকে বিনামূল্যে ব্যয়বহুল কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট ডিভাইস দেওয়া হয়। এখানে এলে তাদের অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। পরে ২০১২ সালে বাংলাদেশের চিকিত্কদের সাথে ব্রিটিশ চিকিত্সকরা মিলে ছেলের কানে দুই দফা অপারেশন করে। তারপর তাকে ভাষা শেখানো হয়। তিন মাসের মাথায় সে একটু একটু করে কথা বলতে শেখে।
জান্নাতুল বুশরা এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। তার সন্তানের বয়স এখন তিন বছর। সাত মাস বয়সের সময় বুঝতে পারেন তার মেয়ে শুনতে কিংবা কিছু বলতে পারে না। প্রাণগোপল দত্ত স্যারকে দেখাই। উনিই বলে দেন, এখানে বিনামূল্যে শিশুদের কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট ডিভাইস প্রতিস্থাপন করা হয়। এখানে এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর আজ জানতে পারলাম আমার সন্তান কক্লিয়ার প্রাপ্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছা ও সহযোগিতা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন কর্মসূচি কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম চালু হওয়ার পর যে সব শিশু জন্ম থেকে শুনতো না বলে কথা বলতে পারতো না তাদের ও তাদের বাবা-মায়ের দৃশ্যপট পরিবর্তন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বর্তমানে দেশের শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুরা কানে শুনতে ও কথা বলতে পারছে। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা ডিভাইস, যা প্রতিস্থাপনের খরচ ক্ষেত্র বিশেষে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। তবে এখানে বাবা-মায়েরা শুধু একটি টোকেন মানি দিয়ে একরকম বিনা খরচেই এই ডিভাইস ব্যবহার করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম-এর কর্মসূচি পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল হাসনাত জোয়ারদার জানান, শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুরা কানে শুনতে না পাওয়ায় কথাও বলতে পারে না। এসব শিশুদের বাবা ও মা সন্তানের মুখে মা ও বাবা ডাক শুনতে পারতো না, তাদের পড়াশুনার কথা ভাবাতো পরের কথা। ডা. জোয়ারদার জানান, প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কানে ডিভাইসের একটি অংশ লাগানো হয়। ২১ দিন থেকে ১ মাস পরে বাইরের অংশটি লাগিয়ে সুইচ অন করা হয়। পরে তাকে শব্দ শেখানো বা স্পিস থেরাপি দেওয়া হয়। শিশুর পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিস্থাপনের উপর জোর দেন ডা. জোয়ারদার। কর্তৃপক্ষ জানান সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এটি একটি স্থায়ী প্রকল্প। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩২৪ জনকে সরকারের খরচে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট-এর বরাদ্দপত্র দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৯৩ জনকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩১ জন নিজ খরছে এই ডিভাইস প্রতিস্থাপন করেছে।
