কোথায় একালের নান্নু-আকরাম!

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১০

মিড অনে ফিল্ডিং করছিলেন নাঈম হাসান।

হাতের ইশারায় সাকিব তাকে পাঠিয়ে দিলেন ডিপ স্কয়ার লেগে; একদম সীমানা দড়ির কাছে। গ্যালারিতে উপস্থিত অল্প কয়েক জন দর্শক হুড়মুড় করে নেমে এলেন কাঁটাতারের বেড়ার কাছে। বেশিরভাগই সমস্বরে ‘নাঈম-নাঈম’ বলে ডাকাডাকি শুরু করলেন। নাঈমও পেছন ফিরে একটু হাত নাড়লেন।

লোকেরা খুব খুশি—ঘরের ছেলে বলে কথা।

হ্যাঁ, বর্তমান বাংলাদেশ দলে চট্টগ্রামের একমাত্র ঘরের ছেলে এই নাঈম হাসান। দীর্ঘকাল ধরে চট্টগ্রামের সবেধন নীলমনি হয়ে ছিলেন তামিম ইকবাল। তিনি ছুটিতে থাকায় নাঈমই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের। কিন্তু চট্টগ্রামের প্রতিনিধি এই মাত্র দুই জনই কেন? জাতীয় দলের আশপাশে আর চট্টগ্রামের খেলোয়াড় কোথায়?

একটা সময় ছিল যখন ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেট মাতিয়ে রাখতেন এই চট্টগ্রামের খেলোয়াড়রা। চট্টগ্রাম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে খেলোয়াড় রেলওয়ে দল হয়ে ঢুকত ঢাকার ক্রিকেটে। তারপর জাতীয় দল পর্যন্ত জায়গা করে নিতেন তারা। এমনও দিন গেছে, যখন জাতীয় দলে একসঙ্গে চট্টগ্রামের ছয়-সাত জন খেলোয়াড় খেলেছেন।

আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, এনামুল হক মনি, নুরুল আবেদীন নোবেলরা যে ধারা শুরু করেছিলেন আফতাব আহমেদ, নাফীস ইকবাল থেকে শুরু করে তামিম ইকবালরা সেই ধারাটা ধরে রেখেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে চট্টগ্রাম জোগান দিয়ে যাচ্ছিল জ্বালানি। কিন্তু সেই চট্টগ্রামেই এখন জ্বালানির সংকট। ঢাকার ক্রিকেটে এখন চট্টগ্রামের খেলোয়াড়দের খুঁজে পাওয়াই কঠিন। জাতীয় দলে তাদের প্রতিনিধি পাওয়াটা তো আরো বিরল ব্যাপার।

কিন্তু কেন চট্টগ্রামের ক্রিকেটের এই অবস্থা? চট্টগ্রামের খেলা তো হচ্ছে। তারপরও কোথায় হারাল এই যুগের নান্নু-আকরামরা?

খোদ মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও আকরাম খান বললেন, খোলা মাঠের অভাবে চট্টগ্রাম শহর থেকে উঠে আসছে না প্রতিভাবান ক্রিকেটার। দুই জনই একমত যে, চট্টগ্রাম শহরের ক্রিকেটার তৈরির যে ‘কারখানাগুলো’ ছিল, সেই মাঠগুলো প্রাণ হারানোতেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামে এক সময় বেশিরভাগ ক্রিকেটারের হাতেখড়ি হয়েছে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের বাইরের অংশ বা আউটার স্টেডিয়ামে। নান্নু একটু ক্ষোভের সুরেই বললেন, ‘ক্রিকেটার তো স্টেডিয়ামে তৈরি হয় না। ক্রিকেটার উঠে আসতে গেলে খোলা মাঠ থাকতে হয়। সেটাই এখন বন্ধ হয়ে আছে। আউটার স্টেডিয়ামে বছর জুড়ে নানারকম মেলা বা এসব হয়। ছেলেদের শুরুটা হবে কোথায়? এসব জায়গায় খেলতে না পারলে নতুন প্রজন্ম থেকে ভালো ক্রিকেটার উঠে আসবে না।’

আকরাম বললেন, শুধু আউটার নয়; তাদের সময়ের বেশিরভাগ খোলা মাঠ এখন বন্ধ হয়ে আছে। তিনি মাঠের নাম ধরেই বললেন, ‘আউটার তো সবচেয়ে বড়ো জায়গা ছিল আমাদের। কিন্তু আরো এরকম অনেকগুলো মাঠ ছিল। প্যারেড মাঠ, পুলিশের মাঠ, রেলওয়ে মাঠ। এগুলোও তো নেই।’

খেলোয়াড় উঠে আসার জন্য এই ধরনের মাঠের প্রয়োজনীয়তাটা দুই জনই বুঝিয়ে বললেন। আকরাম একটু বিস্তৃত করে বললেন, ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে গেলে আপনাকে ভালো অ্যাথলেট হতে হবে। শুধু বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলে আপনি বড়ো ক্রিকেটার হতে পারবেন না। ছোটোবেলায় খোলা মাঠে ফুটবল, হকি, ক্রিকেট সব খেলে নিজেকে তৈরি করতে হয়। সেখান থেকে আসবে ক্রিকেটার। আমরা সেভাবে উঠে এসেছি। কিন্তু এখনকার ছেলেরা সেই সুযোগ পাচ্ছে না।’

এই সুযোগটা নষ্ট হওয়াতেই আমরাও আর খুঁজে পাচ্ছি না নতুন একজন নান্নু বা নতুন একজন আকরাম। এই নতুনদের দেখতে না পাওয়ার হতাশা আমাদের চেয়েও আকরাম-নান্নুদেরই বেশি। নান্নু হাহাকার করেই বলছিলেন, ‘খুব কষ্ট লাগে। আজ আমাদের শহরে টেস্ট হচ্ছে। কিন্তু নিজেদের খেলোয়াড় দলে খুঁজে পাই না। এটা চট্টগ্রামের ক্রিকেটার হিসেবে আমাদের জন্য বেদনার ব্যাপার।’