বর্তমান কালকে বলা হয় ইন্টারনেটের যুগ। ইন্টারনেট আজ অপরিহার্য বস্তু। সারাবিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়া আসিয়াছে এই প্রযুক্তি। বিশ্বকে পরিণত করিয়াছে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বৈশ্বিক গ্রামে। ইন্টারনেট-সেবা দিয়া বেসরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি বাজার মাত করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল কাঙ্ক্ষিত ইন্টারনেট-সেবা দিতে পারিতেছে না। এই কোম্পানির সুলভ ইন্টারনেট-সংযোগের প্রতি অনেকের আগ্রহ রহিয়াছে। কিন্তু সেবা ভালোমত না পাওয়ায় এর প্রতি গ্রাহকদের আস্থার অভাব বিদ্যমান। সম্প্রতি প্রকাশিত ইত্তেফাকের এক খবরের শিরোনাম হইল—‘বরিশালে ইন্টারনেট সংযোগ আছে, সেবা নাই’। এখানে ইন্টারনেট সেবার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। প্রায়ই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। নাই পর্যাপ্ত দক্ষ টেকনিশিয়ান। ফলে গ্রাহকদের দুর্ভোগেরও অন্ত নাই। বিটিসিএলের বরিশাল বিভাগীয় অফিসে ২৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকিলেও তাহাদের মধ্যে দক্ষ টেকনিশিয়ানের এত অভাব কেন তাহা বোধগম্য নহে। ইহা কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতার মধ্যে পড়ে না?
আসলে সরকারি অফিস নিয়া আছে হাজারটা প্রশ্ন। যোগ্যতাসম্পন্ন লোক না থাকায় এবং তত্স্থলে অযোগ্যদের দাপট বাড়িয়া যাওয়ায় অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান চলিতেছে জোড়াতালি দিয়া। ইহাতে যে নানা প্রকার অনিয়ম ও দুর্নীতি বাসা বাঁধে, তাহা দূর করিবার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। কথায় বলে সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের নয়ছয় বা অপচয় এমনভাবে করা হয় যে তাহা সামাল দেওয়া কঠিন হইয়া পড়ে। যেইখানে বেসরকারি মোবাইল কোম্পানি ও বেসরকারি ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা সফলভাবে তাহাদের সেবা পরিচালনা করিতেছে, সেইখানে বিটিসিএল শোনাইতেছে ব্যর্থতার কাহিনি। শুধু বরিশাল জেলা নহে, দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও ভোলা জেলায়ও রহিয়াছে। রহিয়াছে অন্যান্য জেলাগুলিতেও। ইন্টারনেট লাইনে নানা সমস্যার ব্যাপারে ফোন দিয়া জানানো হইলেও অনেকে ক্ষেত্রে কেহ যোগাযোগই করেন না। জবাব পাওয়া যায় না ইমেইলেরও। অথচ বেসরকারি মোবাইল কোম্পানিগুলি কল সেন্টার ও সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করিতেছে। বিটিসিএল সম্প্রতি তাহাদের কলরেট ও ইন্টারনেটের দাম কমাইয়াছে। ইহাতে তাহাদের গ্রাহকসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইবার কথা। কিন্তু সেবার মান ভালো না হওয়ায় গ্রাহকরা বিমুখ হইতেছে। তাই দক্ষ জনবল বৃদ্ধি ও বিটিসিএলের সেবা আধুনিকায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নতি আমরা কামনা করি।
বর্তমানে দেশে ইন্টারনেটের গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ কোটি। আর বিটিসিএল হইল একমাত্র সরকারি আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন হইতে লাইসেন্সধারী ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করিয়া থাকে। বিটিসিএল একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হইলেও বেসরকারি আরো বেশ কয়েকটি আইআইজি রহিয়াছে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি আইআইজির সংযোগ না থাকায় বিটিসিএলের ইন্টারনেটই একমাত্র ভরসা। আর এখানেই জনভোগান্তি বেশি। জনশ্রুতি রহিয়াছে যে, বেসরকারি আইআইজি প্রতিষ্ঠান হইতে আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো যাহাতে ইন্টারনেট কিনিতে বাধ্য হয়, এইজন্য বিটিসিএলের ইন্টারনেটের লাইনে ইচ্ছাকৃতভাবে সমস্যা সৃষ্টি করা হয়। ইহা অপ্রত্যাশিত। যেহেতু মফস্সল শহরের ইন্টারনেট-সংযোগ লাইনে ত্রুটি থাকিবার কারণে সরকারি-বেসরকারি অফিসে ই-ফাইলিংসহ বিভিন্ন কাজে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যাহত হয়, তাই এইসব অঞ্চলে বিটিসিএলের ইন্টারনেট সংযোগ লাইন ত্রুটিমুক্ত ও দ্রুতগতি সম্পন্ন করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
