বহু আগে থেকে আশুরা অনেক গুরুত্ব বহন করলেও ৬১ হিজরির ১০ মুহাররম কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা) এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ আশুরাকে করেছে আরো গুরুতপূর্ণ ও তাত্পর্যপূর্ণ। হয়রত মুয়াবিয়া (রা) বিশ বছর সর্বসম্মতভাবে খলিফা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার পর ৬০ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে মজলিশে শুরা ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি তার পুত্রকে পরবর্তী শাসক হিসেবে মনোনয়ন দেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খেলাফতের দাবি করলে তত্কালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ এলাকার মানুষ তা মেনে নেন। পক্ষান্তরে মাদিনার অধিকাংশ মানুষ, ইরাকের অনেকে বিশেষ করে কুফার জনগণ তা মানতে অস্বীকার করেন। কুফার জনগণ ইমাম হোসেনকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কুফার লক্ষাধিক মানুষ ইমাম হোসেনকে খলীফা হিসেবে বায়াত পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রে তারা দাবি করেন যে, সুন্নাহ পুনর্জীবিত এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন। মদিনা অবস্থানরত সাহাবীগণ এবং ইমাম হোসাইনের আপনজনেরা ইমামকে কুফায় যেতে বারণ করেন।
হোসাইন (রা) তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে ইরাকের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করেন। মুসলিম বিন আকিল কুফায় আগমন করার সাথে সাথে ১৮ হাজার কুফাবাসী তার কাছে এসে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে। এবং তারা শপথ করে বলে, অবশ্যই আমরা জানমাল দিয়ে ইমাম হোসাইনকে সাহায্য করবো। তখন মুসলিম বিন আকিল ইমাম হোসাইন (রা) এর নিকট পত্র পাঠিয়ে জানালেন যে, কুফার পরিস্থিতি সন্তোষজনক, তিনি যেন আগমন করেন। এই সংবাদের ভিত্তিতে ইমাম হোসাইন (রা) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এই খবর ইয়াজিদের নিকটে পৌঁছালে কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশীর কে পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে কুফার গভর্নরের দায়িত্ব প্রদান করেন। এবং তাকে এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ইমাম হোসাইন (রা) যেন কোনভাবেই কুফাতে প্রবেশ করতে না পারে। ওবায়দুল্লাহ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে। এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইন (রা) কে প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।
ওবায়দুল্লাহর বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা) বললেন, আমিতো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছো বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদেরকে যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি অথবা সরাসরি ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সাথে বোঝাপড়া করি। কিন্তু ইবনে জিয়াদ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে তার হাতে আনুগত্যের শপথ নিতে আদেশ দেয়। ইমাম হোসাইন (রা) ঘৃণা ভরে তার এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন।
আশুরার দিন সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের বাহিনী হোসাইন (রা) এর উপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সকল পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা) এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। হোসাইন (রা) সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ সকল পুরুষ সাথী সবাই একে একে শাহাদাতের অমিয়সুধা পান করেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহিদ করা হয়। সিনান বা শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তাঁর মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে যে, দুনিয়ার জয়-পরাজয়, সফলতা-ব্যর্থতা, ক্ষমতা বা শক্তি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মাঝেই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা।
lলেখক : ইসলামি গবেষক
