প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অপ্রিয় হলেও সত্যি যে মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে আমাদের সাগর আজ ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, পরিবেশ দূষণ, তেল নিঃসরণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণ, শব্দ দূষণ এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তন এসবের অন্যতম কারণ। এর ফলে সাগর ও মহাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য যে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে তাই নয়, বেশিরভাগ আইওরা সদস্যভুক্ত দেশগুলো সুনামি ও সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তৃতীয় আইওরা সুনীল অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন এর (ব্লু ইকনমি মিনিস্টেরিয়াল কনফারেন্স) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওরা) দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করছে।
আইওরা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমুদ্রের তলদেশের অনাবিষ্কৃত সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এই অঞ্চলে একটি অভিন্ন টেকসই সুনীল অর্থনৈতিক বেষ্টনী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুনীল অর্থনীতিকে সামনে রেখে সমুদ্রে অব্যবহূত ও এর তলদেশে অ-উন্মোচিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এই অঞ্চলে যার যার টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করার সুযোগ রয়েছে। সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে আমরা দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি।’ তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উদ্ভিদ ও প্রাণিজগেক বিপদগ্রস্ত করে তুলছে এবং মানব জাতিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাগর ও মহাসাগর গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপের প্রায় ৯০ শতাংশই শোষণ করে থাকে। সমুদ্র বাস্তু ধ্বংস হলে মানবজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে উল্লেখ করে তিনি সকলে মিলে এই বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য কাজ করার আহ্বান জানান।
সমুদ্রের জৈব সম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার মত্স্য আহরণের সকল প্রকার ক্ষতিকারক পদ্ধতি ও উপায়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং অন্যান্য অপরাধ দমনেও কার্যকর আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন। শান্তি, নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খেয়াল রাখতে হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইওরা মেরিটাইম সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়তা, মত্স্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহায়তা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সর্বোপরি সুনীল অর্থনীতির সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তথাপি, নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আমরা কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আইওরা সদস্যদের মধ্যে যে কর্মতত্পরতা ও উদ্যম সৃষ্টি হয়েছে তা নিকট ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রসম্পদের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম ‘সমুদ্র অঞ্চলের সীমা নির্ধারণ, সমুদ্র সীমানায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য ‘দি টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স এন্ড মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট, ১৯৭৪’ প্রণয়ন করেন। তিনি বলেন, আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন যে, বঙ্গোপসাগরে মত্স্য সম্পদ সংরক্ষণ, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য আমাদের সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থা প্রণয়ন করেছে। আমরা বছরের ৬ মাস মা ইলিশ ও মাছের পোনা আহরণ এবং সমুদ্রের নির্দিষ্ট অঞ্চলে বছরে ৬৫ দিন সকল প্রকার মত্স্য আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি। অতিরিক্ত মত্স্য আহরণের ওপরে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ আমাদের জন্য বিশেষ সুফল বয়ে এনেছে।
