মোজাহেদুল ইসলাম ঢেউ
বহু মানুষের কাছেই মোবাইল ফোন হচ্ছে এমন এক জানালা - যা দিয়ে তারা বিশ্ব দেখেন। কিন্তু এই মোবাইল ফোনই যদি হয়ে ওঠে আপনার ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়ার জন্য ‘অন্য কারো’ জানালা, তখন কী হবে? এটি কি কখনো আপনার মনে আসে যে আপনার পকেটের ভেতরেই আসলে লুকিয়ে আছে এক গুপ্তচর?
বহু দূর থেকেই হ্যাকাররা আপনার মোবাইল ফোনে স্পাইওয়্যার বা গুপ্তচর-প্রযুক্তি ঢুকিয়ে দিয়ে আপনার ফোনে থাকা সব তথ্য পেয়ে যেতে পারে। এরকম একটি অবস্থা কল্পনা করুন—যেখানে এই স্পাইওয়্যার দিয়ে কেউ আপনার ফোনের মাইক্রোফোন থেকে শুরু করে ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত নিয়ে নিচ্ছে। মনে হতে পারে একটি বেশ কষ্টকল্পিত ব্যাপার, কিন্তু আসলে তা নয়।
এরকম সফটওয়্যার ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। এই সফটওয়্যার এখন ব্যবহার করা হচ্ছে সাংবাদিক, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মী বা আইনজীবীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখার জন্য। আমাদের পকেটে থাকা মোবাইল ফোন যে গুপ্তচরে পরিণত না হয়, তা ঠেকানোর জন্য আমরা কী করতে পারি?
সফটওয়্যার যখন অস্ত্র
মাইক মারে একজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। কাজ করেন স্যান ফ্র্যান্সিসকোর ‘লুকআউট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। মোবাইল ফোন এবং এতে সংরক্ষিত তথ্য কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়ে তারা পরামর্শ দেয় বিভিন্ন দেশের সরকার থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পর্যায়ের ভোক্তাদের। বিশ্বের সর্বাধুনিক এই গুপ্তচর প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি। তার মতে, এই প্রযুক্তি এতটাই শক্তিশালী এবং মারাত্মক যে একে একটি ‘অস্ত্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
‘যারা এই সফটওয়্যার তৈরি করেছে তারা আপনার ফোনের জিপিএসের মাধ্যমে আপনাকে সব জায়গায় অনুসরণ করতে পারে’—বলছেন মাইক মারে।
তিনি আরও বলেন, ‘ওরা যে কোনো সময় আপনার ফোনের মাইক্রোফোন বা ক্যামেরা অন করতে পারে এবং আপনার চারপাশে যা ঘটছে তার সবকিছু রেকর্ড করতে পারে। আপনার ফোনে যত রকমের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ রয়েছে, সবগুলোতে তারা ঢুকে পড়তে পারে। ওরা আপনার সব ছবি, কনট্যাক্ট, আপনার ক্যালেন্ডারের সব তথ্য, আপনার সব ই-মেইল, যত রকমের ডকুমেন্ট —সব চুরি করতে পারে।’
এটি কার্যত আপনার ফোনকে একটি আড়িপাতা যন্ত্রে পরিণত করে। যেটি দিয়ে তারা আপনার প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির ওপর নজরদারি চালায়। আপনার ফোনের সব তথ্য চুরি করে।
স্পাইওয়্যারের ব্যবহার নতুন কোনো জিনিস নয়। বহু বছর ধরেই নানা রকমের স্পাইওয়্যার চালু আছে।
কিন্তু এই সর্বশেষ স্পাইওয়্যার এতটাই মারাত্মক যে, এটি আসলে সাইবার নিরাপত্তার জন্য খুবই ভিন্ন ধরনের এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এই স্পাইওয়্যারের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি কারো মোবাইল ফোনের তথ্য আদান-প্রদানের সময় নয়, বরং ফোনে থাকা অবস্থাতেই চুরি করে। এটি মোবাইল ফোনের যত রকমের কাজ, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আর এই প্রযুক্তি এতটাই অত্যাধুনিক যে এটিকে সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে হ্যাকিং
২০১৯ সালের মে মাসে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারের নিরাপত্তায় একটা বড়ো ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। বিশ্ব জুড়ে বহু মানুষ প্রতিদিন তাদের পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জার ব্যবহার করেন। এই হ্যাকিং-এর ফলে কেউ কেবল আপনার ফোন কলেই শুধু আড়ি পাততে পারবেন, এটা যদি ভেবে থাকেন, তাহলে ভুল করবেন। এটি আসলে ফোনের সফটওয়্যারে ঢোকার রাস্তা তৈরি করল মাত্র। একবার এই পথ তৈরি হওয়ার পর হ্যাকাররা সেই ফোনে তাদের ইচ্ছেমতো যত খুশি স্পাইওয়্যার ঢুকিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে যাকে টার্গেট করা হয়েছে, তাকে হয়তো কোনো লিংকে ক্লিকও করতে হবে না। একটি ফোন কল করেই তার ফোন হ্যাক করা হয়েছে। ফোন করে কলটি কেটে দেওয়া হয়েছে। একে বলা হয় ‘জিরো ক্লিক’ টেকনোলজি।
হোয়াটসঅ্যাপ অবশ্য খুব দ্রুতই এর মোকাবিলায় আপডেট ছাড়ে। কিন্তু এখনো কেউ জানে না, এই হ্যাকিং প্রযুক্তির পেছনে কে ছিল। হোয়াটসঅ্যাপের পর এবার টার্গেট কোন অ্যাপ?
হ্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই
এ ধরনের স্পাইওয়্যার যারা তৈরি করে, তারা চাইলেই যে কোনো দেশে তা বিক্রি করতে পারে না। এর জন্য এক ধরনের ‘এক্সপোর্ট লাইসেন্সের’ দরকার হয়, যেমন- লাগে অস্ত্র বিক্রির জন্য। কেবল গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীদের থামাতেই এ ধরনের স্পাইওয়্যার কাজে লাগানোর কথা। তবে সিটিজেন ল্যাব এ নিয়ে যে ফাইলটি তৈরি করেছে তাতে তারা বলছে, এই প্রযুক্তি যেসব সরকার কিনেছে, তারা এটির অপব্যবহার করছে। এই সফটওয়্যার যারা তৈরি করেছে, তাদেরকে কি এজন্যে দায়ী করা যাবে?
এ রকম স্পাইওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একটি ইসরায়েলি কোম্পানি—এনএসও গ্রুপ। এরা গত এক দশক ধরে এই ব্যবসায় আছে এবং এই ব্যবসা থেকে তারা শত শত কোটি ডলার মুনাফা করছে। আবদুল আজিজের আইনজীবী এই কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার মক্কেলের ফোন হ্যাক করার অভিযোগে। এই মামলার ফল কী দাঁড়ায় তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর তৈরি সফটওয়্যার কি কাজে ব্যবহূত হয়, সেটির দায় কোম্পানির ওপর বর্তায় কি না, সেই প্রশ্নের সমাধান হতে পারে এই মামলার মাধ্যমে।
ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও এ বিষয়ে বিবিসিকে কোনো সাক্ষাত্কার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধ এবং তদন্তের জন্য যে ধরনের প্রযুক্তি দরকার, তারা লাইসেন্সপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সে রকম প্রযুক্তি সরবরাহ করে। তাদের প্রযুক্তি বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
কিন্তু যে আইনজীবী এই মামলায় লড়ছেন, তার ফোনে কিন্তু এরই মধ্যে রহস্যজনক হোয়াটসঅ্যাপ ফোনকল আসতে শুরু করেছে।
যে স্পাইওয়্যার ডিলিট করা যাবে না
এ রকম একটি স্পাইওয়্যার তৈরি করারই স্বপ্ন দেখে এই ইন্ডাস্ট্রিতে যারা কাজ করে তারা। যে স্পাইওয়্যার কেউ ধরতেই পারবে না, কেউ ডিলিট করতে পারবে না—এটি তাদের চরম আরাধ্য। যদি তারা এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তাহলে যার ফোন হ্যাক হয়েছে, সে কোনো দিন অভিযোগই করবে না, কারণ সে জানতেই পারবে না তার ফোন হ্যাক হয়েছে। ব্যাপারটা হয়তো জেমস বন্ড ছবির কাহিনির মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এর মারাত্মক পরিণতি আছে বিশ্বের জন্য। আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার জন্য এ রকম চরম হুমকি সত্যিই আছে এবং ভবিষ্যতের জন্য আমাদের এই কথাটা মনে রাখা দরকার।
সূত্র : বিবিসি
