আলোকপাত
মো. রফিকুল ইসলাম
প্রবীণেরা আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, প্রতিবেশী—আমাদের গুরুজন, আমাদের শ্রদ্ধাভাজন, আমাদের শিকড়। বাবা-মা, দাদা-দাদি পরিবেষ্টিত যৌথ পরিবারগুলো ছিল আবহমান বাংলার ঐহিত্য, গৌরব ও অহংকার। সভ্যতার বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই শিকড় আজ বিলীন হবার পথে। বাংলার ঐতিহ্য যৌথ পরিবারগুলো ভাঙতে ভাঙতে পরিণত হয়েছে ছোটো পরিবারে। সে পরিবারে শুধুই বাবা-মা ও সন্তান। জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের যৌথ পরিবারের সংখ্যা এখন ১০ শতাংশে নেমে আসছে। প্রবীণেরা ছিলেন পরিবারের অভিভাবক, কর্তাব্যক্তি। দাদা-দাদিবিহীন পরিবারের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা দাদা-দাদির স্নেহ-ভালোবাসা ও শাসন থেকে বঞ্চিত। ফলে সন্তানদের মন-মানসিকতায় হতাশা ও শূন্যতার ছাপ বিরাজ করে। পরিবারগুলো হলো সন্তানদের জ্ঞান অর্জনের প্রধান ও প্রথম স্তর। কোমলমতি সন্তানেরা সেই শিক্ষা থেকে অবহেলিত ও বঞ্চিত। তারা সংকীর্ণতা ও একাকিত্বের মধ্যে বড়ো হয়ে উঠছে। ফলে তাদের সঙ্গে প্রবীণদের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। সামাজিক বন্ধন ও ভারসাম্য নষ্ট হয়।
অন্যদিকে প্রবীণরা জীবনসায়াহ্নে এসে একাকিত্ব, অসহায়ত্ব, সেবা-যত্নহীন অবস্থায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করেন। ফলে অধিকাংশ প্রবীণ ভালো নেই, শান্তিতে নেই। তাদের এই দুর্বিষহ রোগ-শোকে জর্জরিত, বিপর্যস্ত, অভিশপ্ত ও একাকী জীবনযাপন আমাদের কারো কাম্য নয়। দেশের এই বিপুলসংখ্যক প্রবীণের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। কেননা বার্ধক্য হচ্ছে প্রতিটি মানুষের অবধারিত সমস্যা। আমাদের নবীনেরা আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের স্বস্তিময় জীবনযাপনের জন্য নবীনদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে নবীনদের আগামী দিনের স্বস্তিময় জীবনযাপনের পথ তৈরি হবে। তাই দয়াদাক্ষিণ্য বা করুণার দৃষ্টিতে নয়, মানবাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্য মর্যাদার যুক্তিতে প্রবীণদের চাওয়া-পাওয়া তথা সমস্যার সমাধান করা দরকার। এটা আমাদের সবার পরম দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেজন্য দরকার গণসচেতনা। অত্যাবশ্যকীয় করণীয় বিষয়গুলো হলো বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, মিডিয়া, সভা-সেমিনারের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো।
আমাদের বাবা-মা এখনো সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিয়েশাদির জন্য নিজেদের জমানো অর্থ ব্যয় করেন। আবার সন্তানেরা চাকরি পাওয়ার পর নিজেদের বেতন থেকে প্রতি মাসে বাবা-মাকে টাকা পাঠায়। আমাদের এ পারস্পরিক সহযোগিতা একত্রে এগিয়ে যাওয়ার মন-মানসিকতা সমাজব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, পশ্চিমা বিশ্বে যা একেবারেই কল্পনাতীত। তাই পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধাশ্রম একেবারেই অপরিহার্য।
আমাদের দেশেও দরকার আছে, তবে তা একেবারে ঢালাওভাবে নয়। যেমন, বাবা-মায়ের খরচ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে, বাবা-মাকে দেখার কেউ না থাকলে, বাবা-মা নিঃসন্তান হলে ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বৃদ্ধাশ্রম যদি দায়িত্ব, কর্তব্য এড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহূত হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই দুঃখজনক এবং অপরাধও বটে। আর্থিকভাবে সচ্ছল কিন্তু নৈতিকতার অবক্ষয়ে ভোগা সন্তান পিতামাতাকে জঞ্জাল বা অকর্মণ্য ভেবে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায়। অথচ নিজেরা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে, আরাম-আয়েশে দিনাতিপাত করে। এ ধরনের বিকৃত মন-মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার। সামাজিক অবক্ষয়িত, নৈতিকতা বিবর্জিত এ ধরনের ঘটনাকে ঘৃণা করে বেশি বেশি করে প্রচার চালানো দরকার। তবে যারা নিজ উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলেছেন তাদেরকে অবশ্যই ধন্যবাদ। কারণ তারা অসহায় প্রবীণদেরকে নিজের পিতামাতার মতো শ্রদ্ধাভরে তাদের সেবাযত্ন করে দুর্বিষহ জীবন থেকে সুরক্ষা করছেন। তারা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। দেশ ও জাতীর স্বার্থে ভবিষ্যত্ উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় প্রবীণদের অর্জিত অভিজ্ঞতা যোগ্যতা, নৈপুণ্য ও অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে সবার সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করা দরকার।
n লেখক : সমাজকর্মী
