স্বার্থের সার্থকতা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:০১

মোহাম্মদ হাফিজ উদ্দিন

 

জগত্ জুড়ে শুধু স্বার্থের লড়াই। এ লড়াইয়ে পিষ্ট হয়ে কত প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে; কত হূদয় ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে; তার ইয়ত্তা নেই। স্বার্থের সঙ্গে মর্যাদার লড়াই যুক্ত হয়ে জগতে নেমে আসে অশান্তির ভয়াল থাবা।  এত যে লড়াই, তথাপি আমাদের সত্যিকার স্বার্থটা কী? জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এসে অনেকেই এই সত্যিটা উপলব্ধি করতে পেরে শুধু একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কিন্তু ততদিনে কতজন যে এই স্বার্থের বলি হয়ে গেছেন!

সমাজে স্বার্থপর মানুষের যেমন অভাব নেই; তেমনি নিঃস্বার্থ আলোকিত মানুষও আছেন। আবার নিঃস্বার্থ নির্লোভ হিসেবে পরিচিত মানুষের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় চরম স্বার্থপরতার ঘটনা। স্বার্থ ও মর্যাদা ভাবনাটি সকলের ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারো ভাবনা জগেক আলোকিত করে, কারো অন্ধ ভাবনা আবার সমাজকে নিয়ে যায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একই সমাজে পাশাপাশি বসবাস করে কেউ তাঁর সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় জগতের কল্যাণে। কেউ আবার সমাজে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে গড়ে তোলে আপন সুখের প্রাসাদ। এই পার্থক্য শুধু জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি আর উপলব্ধিতে। কারো উপলব্ধিতে জগতের সকল মানুষ সমান। আর এ সমানাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে তিনি এগিয়ে যান দৃঢ় প্রত্যয়ে। একজন মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো কখনো পুরোপুরি পরিবর্তন এনে দেয় একটি সভ্যতার। মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ধাবিত হয়।

ভালো বা মন্দ সব ধরনের কাজের পিছনে যে জিনিসটি লুকিয়ে থাকে তা হলো মনের সন্তুষ্টি ও আনন্দ। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনে কিছু না কিছু আনন্দ নিহিত থাকে, থাকে সন্তুষ্টি।  আনন্দ না থাকলে মানুষ কোনো কাজই করতে পারত না। যে লোকটি সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে দিনশেষে কিছু চাল, তরিতরকারি, মাছ আর সন্তানের জন্য এক প্যাকেট বিস্কুট হাতে বাড়ি ফেরে, তখন তাঁর এ পবিত্র আনন্দ উপলব্ধি করার মতো মন সকলের থাকে না। একজন ছাত্র যে প্রচুর পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল করে, তখন সেও এর মধ্যে প্রচুর আনন্দ খুঁজে পায়। যা তাকে পরবর্তী বছরে আরো ভালো ফলাফল করার জন্য উত্সাহ যোগায়। আবার একজন বখাটে যে লেখাপড়া বাদ দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকে, সেও এর মধ্যে কোনো না কোনো অনৈতিক আনন্দ খুঁজে পায়। নিজের সম্পদ ভোগের অধিকারকে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে যারা অন্যের মুখে হাসি ফোটান, তাঁরাও কিন্তু পরমানন্দ অনুভব করেন এবং সেখানেই খুঁজে পান জীবনের চরম সার্থকতা। তাঁরা মরণশীল হয়েও যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন মানুষের অন্তরে।

তাই নৈতিক ও ভালো কাজে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি অনৈতিক ও মন্দ কাজেও আনন্দ আছে। তবে এ দুই আনন্দ কিন্তু এক নয়। ভালো কাজের আনন্দ স্থায়ী, আর মন্দ কাজের আনন্দ অস্থায়ী। নৈতিক যে আনন্দ তা মানুষকে তার সঠিক কর্মপথ দেখায়, লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। নৈতিকতার মধ্য দিয়ে যে আনন্দ উপলব্ধি করা যায়; তার সুফল কেবল একজন ব্যক্তি নিজেই ভোগ করেন না; তাঁর পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সকলেই ভোগ করে।

জগতের ধারাবাহিকতায় শুধু জন্ম, বেড়ে ওঠা আর মৃত্যুর নামই মানব জীবন নয়। আসুন, একটু ভাবি, খামখেয়ালিপূর্ণ স্বার্থের সার্থকতা আসলে কতটুকু?

নেত্রকোনা