জিম্বাবুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুগাবে আর নেই

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৫০

জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে আর নেই। ৯৫ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর মুগাবে মারা গেছেন। এপ্রিল থেকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন রবার্ট গ্যাব্রিয়েল মুগাবে। খবর বিবিসির

স্বাধীনতার নায়ক থেকে স্বৈরশাসক

জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনে ১৯৮০ সালে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন রবার্ট মুগাবে। ১৯৮৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রেসিডেন্ট হন। ১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন রোডেশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন মুগাবে। ১৯৭৩ সালে কারাগারে থাকাকালীন সময়েই জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ওই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি।                         স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে কৃষ্ণাঙ্গদের যুক্ত করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন মুগাবে।

রবার্ট মুগাবে জিম্বাবুয়েতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অবসানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮০ সালে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে যে স্বপ্ন অর্জিত হয়েছিল তা ধূলিস্যাত্ হয়ে যায় অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্নীতি ও সহিংসতার প্রকোপে। রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নির্মম অত্যাচার করা বা অব্যবস্থাপনার কারণে একসময়কার সমৃদ্ধিশালী দেশকে দুর্দশার মুখে ঠেলে দিলেও তার জন্য আফ্রিকার অন্যান্য দেশের নেতাদের সমর্থনের কমতি ছিল না কখনো।

১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় জানু-পিএফ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৪ সালে বন্দিত্ব বরণ, প্রায় দশ বছর রোডেশিয়ার কারাগারে ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুগাবে। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ক্রমেই তিনি বিরোধীদের ওপর নীপিড়ন-নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ আছে।

২০০৮ সালের মার্চে প্রথম দফা নির্বাচনে হারলেও জুনে দ্বিতীয় দফায় তার প্রতিদ্বন্দ্বি সভাঙ্গিরাই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে আবারো নির্বাচিত হন তিনি। সভাঙ্গিরাইয়ের সমর্থকদের ওপর হামলা নির্যাতন অব্যাহত থাকায় কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে দাবি করে আসছিলেন তিনি। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সভাঙ্গিরাইকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করান মুগাবে। তবে সভাঙ্গিরাইয়ের সমর্থকরা তখনো নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। ২০১৩ সালে আবারো ৬১ ভাগ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুগাবে। ফলে আবারো এককভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সেবারের নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে মুগাবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ধারণা করা হয় যে তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন তার স্ত্রী গ্রেস মুগাবে।

২০১৫ সালে মুগাবে ঘোষণা করেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন যখন তার বয়স হওয়ার কথা ৯৪ বছর। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি তার উত্তরসূরি কে হবেন এমন আলোচনার সময় এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, ঈশ্বর তুলে নেওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবো। তবে ঈশ্বর নয়, জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনীর জন্য ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন মুগাবে। ২০১৭ সালে ১৫ নভেম্বর গৃহবন্দি হন মুগাবে এবং তার চারদিন পর তার রাজনৈতিক দল জানু-পিএফ পার্টির শীর্ষ নেতার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। এর আগে তিনি এবং তার পরিবার ভবিষ্যতে যাতে বিচারের সম্মুখীন না হন সেজন্য একটি চুক্তিও করেন।

আফ্রিকা থেকে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা দূর করতে মুগাবে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে মনে করা হতো। এজন্য তিনি পুরো আফ্রিকায় নায়কের সম্মান পেতেন। সেই মুগাবেই পরিণত হয়েছিলেন স্বৈরশাসক। ক্রমাগত মানবাধিকার লংঘন করে একসময়ের সমৃদ্ধশালী জিম্বাবুয়েকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছিলেন তিনি। জিম্বাবুয়েকে বহু বছর তাড়া করে বেড়াবে মুগাবের রাজনীতির লিগ্যাসি।