তরুণদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া এই প্রজন্মের প্রতিনিধি কান্তারা কে খাঁন। র্দীঘ দিন ধরে সুচিন্তা বাংলাদেশের যুগ্ম আহবায়ক এর দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। পাশাপাশি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে তরুণদের মাঝে সমান গ্রহণযোগ্য কান্তারা কে খাঁন আমাদের এবারের প্রজন্মে জানিয়েছেন তার বেড়ে উঠার গল্পসহ তারুণ্যের বিকাশের লক্ষ্যে নানা অনুকরণীয় গল্প। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
বেড়ে উঠার গল্প
বাবা (সাবেক বাণিজ্য ও পর্যটন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য কর্নেল ফারুক খাঁন) আর্মিতে ছিলেন। ফলে প্রতি এক-দুই বছর পর পর তার বদলি হওয়ার কারণে আমার প্রচুর স্কুল চেঞ্জ হতো। যদিও আমি আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। তারপর এসে প্রথম ভর্তি হলাম ক্লাস থ্রিতে কাপ্তাই। পরে এরকম দু বার স্কুল বদলিয়েছি। এজন্য নতুন নতুন বন্ধু করার প্রবণতা ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়েছে। আমি যখন মেট্রিকে পড়াশোনা করি, তখন বাবা আর্মি থেকে সেলফ রিটায়ারমেন্ট নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন। আমি মনে করি তারপর থেকেই আমি রাজনীতিতে জড়িত, কারণ বাবাকে তো আমি ২৩ বছর ধরে দেখছি। আমার জীবনে বাবার প্রভাবটাই বেশি, আর বাঙালি সংস্কৃতির সবটাই মায়ের কাছে পাওয়া। ছোটবেলায় গান-নাচ শিখেছি। বাবা-মায়ের ফোকাস ছিল আমি ও আমার ছোট বোন—দুজনের পড়াশোনার বিষয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ করা যেন না হয়।
রাজনীতির সাথে সখ্য
রাজনীতিটা আমাদের পরিবারে বাইরের বিষয় ছিল না, কারণ বাবা এটাকে ঘরোয়াভাবেই নিয়েছেন। বাবা সবসময় বলতেন, ‘তুমি আলাদা কিছু না। সবার মতো তোমারও দুটো চোখ, চারটা হাত-পা আছে। সবার সাথে যদি মিলেমিশে থাকতে পারলে জীবনে প্রকৃত সম্মান পাওয়া যায়। গত ২৩ বছর আমি দেখেছি, বাবা প্রতি মাসে দু’বার এলাকায় যান। সেটা উনি সরকারি দলে থাকুক আর না-থাকুক। যখন ঢাকায় ফিরতেন, আমরা ২-৩ দিন ভয়ে কথা বলতে পারতাম না। যদি বলতাম প্রচণ্ড গরম, উনি বলতেন দেশের মানুষ কষ্টে আছে, আর তুমি আছ গরম নিয়ে! বাবার এমন চিন্তাগুলোই আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলেছে।
২০১২ সাল থেকে আমি সুচিন্তা বাংলাদেশের সাথে কাজ করছি। নিজেও মানুষের সাথে মিশে বুঝতে পারছি তারা আলাদা কোনো কিছুই না। মানুষের ভালোবাসা, দোয়া পাওয়াটাই বড় বিষয়।
আমার দেশ আমার সবকিছু
আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল আর্মিতে যাওয়ার, কিন্তু যখন বাবা আর্মি ছেড়ে দিলেন, আমি বিদেশে পড়তে চলে গেলাম। তবে আমি সবসময় ফিরে আসতে চেয়েছি। বাবা সবসময় বলতেন, ‘তোমার দেশ, তোমার সবকিছু। বিদেশে যত বছরই থাকো না কেন, সেটা তোমার নিজের দেশ কখনো হবে না। পরবর্তীতে যখন বাবা রাজনীতিতে এলেন, তখন আস্তে আস্তে সম্পর্কিত হয়েছি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সাথে। আমি ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ শুনলে হারিয়ে যাই, ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে’ শুনলে একাত্তরের ভয়ংকর রাতগুলোর কথা উপলদ্ধি করি।
অনুপ্রেরণা খুঁজি যেখানে
বাবা যখন প্রথম মন্ত্রণালয়ে যান, তখন বললেন, ‘আগে তোমাদের উপর দুটো চোখ ছিল, এখন দশটা চোখ আছে। এই পাঁচ বছরে এমন কিছু করো না যাতে ফারুক খাঁনকে মরে যেতে হয়। এমন কোনো কিছু যেন না হয় যাতে অসম্মান বা লজ্জিত হতে হয়।’ সংযত থাকার চেষ্টা করেছি, জানি না কতটুকু করতে পেরেছি। এই জিনিসটা বাবা এখনো বলেন, ‘কারো ভালো করতে না পারলে চুপ করে থাকো, কিন্তু কারো খারাপ কোরো না।’ আমার প্রথম অনুপ্রেরণা বাবা মা হলেও একজন মেয়ে হিসেবে আমার অনুপ্রেরণার জায়গা দখল করে রেখেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি একজন বাবা ও মেয়ের সম্পর্ককে দেখি। ’৭৫ সালে যারা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুর তিন ছেলেকে মেরে ফেললে বঙ্গবন্ধুর পরিবার শেষ হয়ে যাবে, তারা বুঝতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর রক্তজোর কতটুকু।
তরুণদের সঠিক বিকাশের লক্ষ্যে
প্রত্যেক তরুণের আদর্শ তৈরির মূল জায়গাটা হলো তাদের পরিবার। এটা কোনো স্কুল কলেজ দ্বারা সম্ভব না। বাচ্চাকে যদি বাবা-মা সময় না দেয় তাহলে তারা পথভ্রষ্ট হবে। এখন যদি অভিভাবকরা বাচ্চাদের নিয়ে দেশের বাইরে ঈদের ছুটি কাটায়, তাহলে বাচ্চারা ঈদের মর্ম কীভাবে বুঝবে। তরুণদের সঠিক বিকাশের লক্ষ্যে ঢাকাস্থ বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ শীর্ষক আলোচনার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তাদের উত্সাহিত করার চেষ্টা করি, বলি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হবে। বঙ্গবন্ধুর গল্প শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার তরুণ প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
হলি আটিজানের ঘটনার পর থেকে ইউনিভার্সিটিগুলোতে ‘জাগো তারুণ্য রুখো জঙ্গিবাদ’ শিরোনামে একটা প্রোগ্রাম শুরু করি। এর জন্য পুরস্কারও পেয়েছি। মানুষ মেরে বেহেশতে যাওয়া যায় না। এটা তরুণ সমাজকে বুঝাতে হবে। জ্ঞান অর্জন ছাড়া উন্নতির কোনো উপায় নেই। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে শিখতে হবে। নিজেদের শিকড়কে চিনতে হবে। নিজেদের অস্তিত্ব বুঝতে হবে।
আগামীর বাংলাদেশ—এটা আমার হ্যাশট্যাগ। এটা আমি একা পারব না। সবাই মিলে একটু হলেও কিছু করে যেতে চাই।
