হামীম রায়হান
দেশ যখন ডেঙ্গুর আক্রমণে কুপোকাত, তখন সেন্টু ভাই কী আর ঘরে বসে থাকতে পারে! সেন্টু ভাই যে সারাক্ষণ দেশের চিন্তায় অস্থির! আমাদের নিয়ে জরুরি মিটিং বসলেন তালতলায়। আমরা সবাই, অর্থাত্ নরেন, ফজল, শাকের, জালাল, সুবেল, পেটুক রুবেল এবং আমি এক প্রকার দৌড়ে উপস্থিত। সেন্টু ভাইকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। গভীর কোনো সমস্যা না হলে ভাইকে এমন চিন্তিত দেখায় না। সবাই গোল করে বসলাম। ভাই বলা শুরু করলেন, ‘দেশ আজ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। মহা দুর্যোগের ঘনঘটা আজ দেশে। মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত। আজ মানুষ মশার ভয়ে অস্থির! আজ সারা দেশে আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু! মানুষ আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর জ্বালিয়ে দিচ্ছে ডেঙ্গু। ও দুঃখিত, আক্রমণ করছে। আমরা নওজোয়ানরা এভাবে ঘরে বসে থাকলে তো চলবে না। আমাদের এই ঘোর বিপদের দিনে এগিয়ে যেতে হবে। কবি বলেছেন, ওমম! নরেন কবি যেন কী বলেছিলেন?’
নরেন উত্তর দেয়, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার....’
‘যাই হোক, কবিতার লাইনটা তো তোরা জানিস। সেই কবিতার লাইনকে মূলমন্ত্র করে আমাদের সামনে এগোতে হবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের কিছু করতে হবে।’
শাকের প্রশ্ন করে, ‘ভাই আমরা কী করব?’
‘আমরা এলাকায় যত ঝোপঝাড় আছে, তা পরিষ্কার করব। যেখানে যত জমে থাকা পানি থাকবে, তা ফেলে পরিষ্কার করব। আর এলাকায় সবাইকে সচেতন করার জন্য মিছিল করব। কী বলিস তোরা?’
সুবেল সেন্টু ভাইয়ের সব কথায় লাফিয়ে উঠে, ‘ভাই দারুণ আইডিয়া! এতে আমরা জনগণের সর্মথন পাব!’
‘শাকের তুই ‘সেন্টু ভাইয়ের সর্মথকগোষ্ঠী’ ফেসবুক পেইজে সবাইরে বিষয়টা জানাই দে। আর আগামী শুক্রবার বিকেলবেলায় আমরা মিছিল সহকারে এই মহতী উদ্যোগটি সম্পন্ন করব। সবাই যেন পাড়ার একতা ক্লাবের সামনে এসে উপস্থিত হয়।’
এবার ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘মনা, তোর দায়িত্ব এক বড় ব্যানার করা। মিছিলের জন্য একটা বড় ব্যানার করবি। ব্যানারে লেখা থাকবে ‘মশা নিয়ে ভাবনা, আর না, আর না।’ সাথে আমার একটা বড় ছবি। এই নে টাকা। আর ফজল তুই ঝোপঝাড় কাটার জন্য দা- কুড়াল এসবের ব্যবস্থা করবি। এবার সবাই যা, কাজে লেগে পড়। এই যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে!’
সবাই যার যার অর্পিত কাজে লেগে পড়ল। ফেসবুক পেইজে নিউজি দেওয়ার পরেই তা ভাইরাল হয়ে গেল। সবাই ভাইয়ের এমন উদ্যোগের প্রশংসা করতে লাগল। আর সবাই ঐদিন একসঙ্গে কাজ করবে বলে কমেন্ট করতে লাগল। আমিও ভাইয়ের স্লোগান ও ছবি সম্বলিত একটা বড় ব্যানার বানালাম।
অবশেষে সব প্রস্তুতি শেষ করে আসল সেইদিন। সবাই বিকেলে ক্লাবের সামনে অপেক্ষা করছে। ভাই এলেন এবং সবার উদ্দেশে বলা শুরু করলেন, ‘ভায়েরা আমার, এই মহেন্দ্রক্ষণে আমি ঘোষণা করছি আজ আমাদের এলাকা হবে মশা মুক্ত। ভাইরা আমার, যেখানেই আজ ঝোপঝাড় দেখব, তাই পরিষ্কার করব। আজকের থিম ‘যেখানে ঝোপ, সেখানেই কোপ’। আর কথা না বলে চলুন সবাই কাজে লেগে পড়ি। সবাই চলুন!’
আমরা সবাই উত্সাহে গদগদ করছি। সবাই হাঁটছি দা-কুড়াল নিয়ে। প্রথমেই পড়ল রহিম চাচার বাড়ির ঝোঁপ। কেটে সাফ! তারপর কাসেমদের ফুলের বাগান। সাথে সাথে তাও শেষ! আজাদের টমেটো গাছ, তৌহিদ ভাইয়ের মরিচ গাছ সব শেষ। এবাবেই এগিয়ে চলে আমাদের কার্যক্রম।
এদিকে গ্রামের সবাই এমন কাজে রীতিমতো রেগে আগুন! অভিযোগ গেছে কাউন্সিলর অফিসে। মিছিল শেষে সবার চোখ গেল আমার করা ব্যানারের দিকে। ব্যানার দেখে সবাই আরো ক্ষেপে গেল। সেন্টু ভাই এসে দিলেন এক চড়।
‘আরে বেটা, মশার মাথায় আমার ছবি লাগালি কোন আক্কেলে? আমি কি মশা?’
‘ভাই বুঝাইতে চাইছি মশা যেমন আমাদের শরীর থেকে রক্ত শুষে নেয়, তেমনি আপনিও আমাদের সমাজ থেকে যত অন্যায়, অনাচার সব শুষে নেবেন। সব অশুভকে দূর করবেন।’
পরের দিন কাউন্সিল অফিসে আমরা গিয়ে ক্ষমা চাইলাম, কিন্তু নাটের গুরু সেন্টু ভাইকে পাওয়া গেল না। এমনকি তারপরের এক মাস ভাইয়ের চেহারা এলাকার কেউ দেখেনি।
ঠিকানাবিহীন।
