তিনটি আসনে রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে করা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আপিল নামঞ্জুর করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে কমিশন। গতকাল নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশন খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন নিষ্পত্তি করে। শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলেও বাকি চারজন অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আপিল খারিজ হওয়ায় খালেদা জিয়া আপাতত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। অবশ্য এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই আপিল শুনানির রায়কে কেন্দ্র করে ইসিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়া বগুড়া-৬, ৭ এবং ফেনী-১ আসনে নির্বাচন করার জন্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে তিন আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিল করে দেন। এর বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। শনিবার দুপুরের আগেই খালেদা জিয়ার তিনটি আপিল একই সঙ্গে শুনানি হয়। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দাবি, রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাদের নেত্রীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন নির্বাচনী অপরাধের অভিযোগে। কিন্তু, বিএনপির চেয়ারপারসনের সাজা হয়েছে দুর্নীতি মামলায়, নির্বাচনী অপরাধে নয়। প্রায় ১৮ মিনিটের চলা টানা শুনানিতে রায় ঘোষণা স্থগিত রাখে নির্বাচন কমিশন। বিকাল ৫টায় পুনরায় শুনানির কথা জানিয়ে দেন কমিশন। এরপর প্রায় পৌনে ১ ঘণ্টা পাঁচজন কমিশনার সিইসির দফতরে বৈঠকে বসেন।
সন্ধ্যায় কমিশন পেন্ডিং আপিলগুলো শুনানির অংশ হিসেবে খালেদা জিয়ার আপিলের বিষয়টি আসে। এ সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নাল আবেদীন ও মাহবুব উদ্দিন খোকন যুক্তিতর্কে অংশ নেন। তারা আইনের ধারা উল্লেখ করে খালেদা জিয়ার পক্ষে রায় দাবি করেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের বিপক্ষে মত তুলে ধরেন। বিএনপিপন্থি আইনজীবী ছাড়াও এসময়ে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের বেশ কয়েকজন আইনজীবী এজলাশে উপস্থিত ছিলেন। উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। সিইসি রায় ঘোষণা করতে যাবেন-এমন সময়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার মাইক্রোফোন হাতে নেন। তিনি বলেন, ‘রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক যথাক্রমে বগুড়া-৬, ৭ ও ফেনী-১ আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে যে আপিল দায়ের করা হয়েছে, তা আইনগত বিশ্লেষণ করে আমার রায় এই আপিল মঞ্জুরের পক্ষে। আমি এই আপিল মঞ্জুর করলাম। মাহবুব তালুকদারের এই ঘোষণার পরপরই বিএনপির আইনজীবীরা উল্লাস করে কোর্ট রুমের পেছনের দিকে চলে যেতে উদ্যত হন। অন্যদিকে আওয়ামী আইনজীবীরা এর বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন। এ সময় নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আপনারা ঠান্ডা হয়ে বসুন। এই রায় পূর্ণাঙ্গ নয়, এটি মাত্র একজনের রায়।’
তখন উত্তপ্ত আদালত কক্ষেই কমিশনার মোঃ রফিকুল ইসলাম মাইক্রোফোন নিয়ে তার রায় ঘোষণা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্তরা নির্বাচন করতে পারেন না। আপিল মঞ্জুর করা যায় না। এ কারণে খালেদা জিয়ার আপিল নামঞ্জুর করা হলো।’ এরপর কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, আপিল নামঞ্জুর করা হলো। কমিশনার কবিতা খানমও এই দুই কমিশনারের পক্ষে মত দেন। সবশেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘আমি আমার কমিশনার রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদাত হোসেন এই তিনজনের পক্ষে রায় দিলাম। এই আপিল আবেদন মঞ্জুর হয়নি।’ সিইসিসহ চার কমিশনার আপিল নাকচ করার পক্ষে রায় দিলে সরকার পক্ষের আইনজীবীরা উল্লাস প্রকাশ করেন। এর পরপরই ইসি সচিব বলেন, খালেদা জিয়ার আপিল গৃহীত হয়নি। ‘৪-১ ভোটে’ এই আপিল নামঞ্জুর হলো। ফলে বিএনপির চেয়ারপারসন ভোটে অংশ নিতে পারছেন না।
শুনানিতে খালেদা জিয়ার
পক্ষে যুক্তি
শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া তিনটি আসন থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা ১২/১ (ঘ) অনুসারে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। এই ধারা নির্বাচনী অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিলের আদেশে যা বলেছেন তা হলো, নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে যদি কেউ অপরাধ করেন, যেমন- মনোনয়নপত্র দাখিলের পর কেউ প্রচারণা শুরু করল বা কাউকে মারধর করল বা ভোটকেন্দ্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করল। অর্থাত্, নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করল। তারা বলেন, মনোনয়নপত্র বাতিল আদেশে খালেদা জিয়ার সাজার কোনো প্রসঙ্গে বলা হয়নি। এখানে বলা হয়েছে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়। খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সেখানে থেকে তিনি কীভাবে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করবেন? যে আদেশ রিটার্নিং কর্মকর্তারা দিয়েছেন, আইনের দৃষ্টিতে তা বৈধ নয়। আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে যথাযথ আদেশ দেবে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা যে আদেশ দিয়েছেন, কমিশন তা বাতিল করবে। আমরা আশা করি, আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নেবেন।’ আইনজীবীদের মতে, রিটার্নিং কর্মকর্তা যে আদেশ দিয়েছেন এখন তার ওপরই কমিশন আদেশ দিতে পারবে। এর বাইরে যাওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই।
রায় ঘোষণার শেষে ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব উদ্দীন খোকন বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার অভিযোগ ছিল-খালেদা জিয়া নির্বাচন সংক্রান্ত অপরাধ করেননি। শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তিনটা আপিল মঞ্জুর করেছেন। খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আর কোনো আইনগত বাধা নেই। গত তিনদিন আমরা দেখেছি, আপিল শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কখনো সিইসি, কখনো অন্যান্য কমিশনার রায় ঘোষণা করেছেন। তারা কমিশনের সকলের পক্ষ থেকেই রায় ঘোষণা করেছেন।
