তাপস হালদার
ডেঙ্গু জ্বর বর্তমানে ঢাকা শহরে একটি আতঙ্কের নাম। যদিও এখন শুধু তা ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই—দেশের ৬৪ জেলায়ই ছড়িয়ে পড়েছে, যা পূর্বের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বছর দুইয়েক আগে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, এবছর ডেঙ্গু জ্বর। অভিভাবকরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন, অফিস-আদালতেও চরম সতর্কতা, ঘরেবাইরে সর্বত্রই দুশ্চিন্তা। এডিস যেহেতু দিনের বেলায় (সকাল ও সন্ধ্যায় বেশি) কামড়ায়, তাই জনমনে একটু অস্বস্তির ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে ডেঙ্গু জ্বরটি মহামারি আকার ধারণ না করলেও এটি যে উদ্বেগজনক পর্যায় চলে গেছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। প্রতিদিন নতুন নতুন লোক আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর তালিকাটাও দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নাই। ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দিনরাত আপ্রাণ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
চিকিত্সা বিজ্ঞানে একটি অসাধারণ কথা আছে, ‘Prevention is much better than cure’ অর্থাত্ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ করা। এ ভাইরাসবাহিত মশা যাতে না জন্মাতে পারে সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে এডিস মশা স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে, ময়লা বা নর্দমার পানিতে নয়। তাই এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানসমূহকে সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। যেহেতু তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ডিম থেকে মশা জন্ম নেয়। তাই আমাদের স্লোগান তুলতে হবে, ‘তিন দিনের এক দিন জমা পানি ফেলে দিন’।
ডেঙ্গু জ্বর এখন শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়। এটা পুরো সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় সমস্যা বা বিপর্যয়। এ বিপর্যয় মোকাবিলা করতে গেলে সমন্বিতভাবে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু সিটি করপোরেশনকে দোষ দিলে হবে না। সিটি করপোরেশন শুধু রাস্তাঘাট অর্থাত্ বাহিরের অংশটাই পরিষ্কার করতে পারে; কিন্তু বাসাবাড়িতে ঢুকে তো কাজ করতে পারবে না। সে কাজটি কিন্তু আপনাকে, আমাকে, নিজেদেরকেই করতে হবে। নিজের ঘর থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুরু করতে হবে। ঘর বা ছাদে রাখা গাছের টবে পানি জমতে না দেওয়া, এসি বা ফ্রিজের নিচের পানি পরিষ্কার করা, বেশি দিনের পানি ফেলে দেওয়া। এসব ক্ষেত্রে সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়বদ্ধতা আছে। দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যকে দোষারোপ করা যতটা সহজ; কিন্তু নিজের কাজটুকু করা ততটাই কঠিন।
মনে রাখতে হবে এ সমস্যা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। তাই সমাধানও এক দিনে হবে না। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা শহরেও একসময় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। কলকাতা সিটি করপোরেশন একটানা ১০ বছর কাজ করে এডিস মশার উপদ্রব একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তারা সারা বছরই মশা নিধনে কাজ করে। ডোবা-নালা, স্বচ্ছ পানি জমার স্থানগুলো এবং সর্বোপরি হাসপাতালগুলো কঠোর নজরদারিতে রাখে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৫-২০ জনের টিম দুটি ভাগ হয়ে কাজ করে। একটি দল মানুষকে সচেতন করে; অপর দলটি মশা জন্ম নিতে পারে, এমন স্থানগুলো চিহ্নিত করে। যদি কোথায়ও কোনো লার্ভা পাওয়া যায়, তাহলে প্রশিক্ষিত একটি টিম এসে জরুরি ভিত্তিতে সেগুলো ধ্বংস করে। এর পরও যদি কারো বাড়িতে বা ঘরে লার্ভা পাওয়া যায়, তাহলে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীদের সেবা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা যে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তা প্রশংসনীয়। মানুষের সেবা করা যে আসলেই মহান, সেটা এবারের সংকটে তারা প্রমাণ করেছেন। ডাক্তারদের নিয়ে আমজনতার ক্ষোভের অন্ত নেই। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, একজন ডাক্তার সর্বোচ্চ কতজন রোগী দেখতে পারেন? হয়তো ৫০ জন। কিন্তু তাকে তো দেখতে হচ্ছে কয়েক শ রোগী। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতাল-সংক্রান্ত সব কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করেছে। তাদের সবাইকে ঈদ করতে হয়েছে হাসপাতালে। সব নাগরিক যখন আনন্দ-উত্সবে ঈদ কাটিয়েছে তখন ডাক্তার-নার্সরা রোগীদের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছে। ডাক্তাররা এবার ডেঙ্গু রোগীর সেবা করে প্রমাণ করেছেন, সংকটকালে কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে ডেঙ্গুর বিপক্ষে লড়াই করছেন। তারা সারাক্ষণ ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে থাকেন বলে তারাও কম ঝুঁকিতে নেই। এ মৌসুমেই ৯ জন ডাক্তার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে শোনা যায়। অনেকেই অসুস্থ হয়েছেন। তারপরও অসুস্থ হওয়ার ভয়ে দায়িত্ব থেকে আগেই সরে পড়েননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রতিদিনই গণমাধ্যমে জনগণকে সচেতনতার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। ডেঙ্গু রোগীর কী করণীয়, কখন হাসপাতালে যেতে হবে, কী খেতে হবে, কী ধরনের ওষুধ খেতে এবং রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার উত্তম কুমার বড়ুয়ার নির্দেশে পুরো হাসপাতালটিই ডেঙ্গু হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। আসনসংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। রোগীর চাপে কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। পরিচালকের সঙ্গে পুরো হাসপাতালের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সুন্দর টিম ওয়ার্ক করে কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু ডাক্তারের কথাই বলি কেন, একজন রোগীকে সুস্থ করার জন্য নার্সদের ভূমিকাও সমান প্রশংসার দাবি রাখে। ঠিকই একজন ডাক্তার রোগীর রোগ সারান কিন্তু একজন নার্স রোগীর পরিচর্যা করেন। রোগী মানসিক ও শারীরিকভাবে যাতে ভেঙে না পড়ে সেজন্য নিরলসভাবে নার্সরাই কাজ করে যান। অনেক ক্ষেত্রে একজন রোগীর মা ও ভগ্নির ভূমিকা তাদের নিতে হয়। এবারের ডেঙ্গু চিকিত্সায় নার্সদের আন্তরিক দায়িত্ব পালন প্রমাণ করেছে যে তারা কতখানি মানবিক ও দায়িত্বপরায়ণ।
n লেখক :সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
