প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার অর্থ বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন রকম। একটি বাচ্চার কাছে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার অর্থ হলো স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা, বাড়ি ফিরে আসা এবং ঘুমিয়ে পড়া। রাস্তায় একজন শ্রমিকের কাছে এর অর্থ হলো সারাদিন তার কাজকর্ম করতে পারা। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে এর মানে হয়তো কম ঘুমানো আর বেশি ভ্রমণ করা বা বেশি কর্মক্ষম হওয়া। একজন যোগীর ক্ষেত্রে, সে ঘুমাতেও চায় না বা খেতেও চায় না। সে কেবল অস্তিত্বের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করেই বেঁচে থাকতে চায়, অন্য কোনো কিছু গ্রহণ করে নয়। দীর্ঘদিন সে এইভাবেই থাকতে চায়।
যে খাবার আপনি খাচ্ছেন, যে জল পান করছেন, যে বায়ু শ্বাস নিচ্ছেন এবং যে সূর্যরশ্মি গ্রহণ করছেন—এগুলো এক ধরনের শক্তি। আপনি প্রতিদিন যে শক্তি অনুভব করছেন, এই জিনিসগুলো তা যোগান দেয়। অন্যভাবে দেখলে, যেটাকে আপনি ‘জীবন’ বা ‘আমি’ বলছেন, সেটাও শক্তি। যদি আপনি জীবনের অন্য মাত্রায় কাজ করতে চান, আপনার উচ্চতর মাত্রার বা উচ্চ গুণমানের শক্তি প্রয়োজন। তার জন্য অনেক পদ্ধতি রয়েছে। একজন মানুষের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করার কিছু চমকপ্রদ পদ্ধতিও রয়েছে; কিন্তু এইসব পদ্ধতির জন্য যথাযথ প্রস্তুতি, ভারসাম্য এবং জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। একজন মানুষ নিজেকে নিয়ে কী করছেন বা কী করছেন না তা বুঝতে হলে তার আরো অনেক বেশি সচেতনতার প্রয়োজন আছে। বেশিরভাগ মানুষ, এমনকি তথাকথিত ‘আধ্যাত্মিক’ মানুষও বেশিরভাগ সময়ই জানেন না তাদের ভিতর কী ঘটছে, বিশেষত এটা যখন তার শরীর বা শক্তির বিষয়ে। আর যখন এটা তাদের মন বা আবেগের ব্যাপারে, সাধারণত তারা বুঝতে পারেন না যতক্ষণ না এটা খুবই তীব্র ভাবে হয়।
এমনটা ঘটা মানে, আপনার জীবনের পুরো প্রক্রিয়াটি আকস্মিকভাবে ঘটছে, আপনার শক্তিও আপতিকভাবেই ঘটছে। যখনই এটা আকস্মিকভাবে ঘটছে, আপনি দেখবেন যে এক দিন আপনি খুবই প্রাণবন্ত রয়েছেন, পরের দিন আর নেই। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন যে কোনো বিশেষ দিনে আপনি যদি খুব খুশি থাকেন, নিজেকে আপনার খুব প্রাণবন্ত মনে হয়। অন্যদিন যখন অতটা খুশি থাকেন না, তখন শক্তিও কম বোধ করেন। আমরা যে সবসময় শান্তিপূর্ণ এবং খুশি থাকার কথা বলি, সেটা শান্তি বা খুশির জন্য নয়; তার একমাত্র কারণ, যদি কোনো মানুষ শান্তিপূর্ণ এবং খুশি থাকেন, তার শক্তি বিশেষভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অন্যথায়, শরীরতন্ত্র অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। কেবল যদি এই শক্তিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে, আপনি তাদেরকে উচ্চতর সম্ভাবনার দিকে চালিত করতে পারবেন।
সুতরাং আপনি যখন বলছেন ‘প্রাণবন্ত’, এটা যদি কেবল নিত্যদিনের জাগতিক কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে আরো একটু প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার ব্যাপার হয়, তার জন্য অনেক সহজ প্রক্রিয়া রয়েছে, যেগুলো তা করতে সাহায্য করবে; কিন্তু আমার কাছে সত্যিকারের প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার অর্থ হলো, আপনি যখন এমনিই বসবেন আপনার পার্থিব শরীর আপনার কাছে কোনো অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে না। আপনার শক্তি যদি সত্যিই সক্রিয় হয়ে ওঠে, পার্থিব শরীর আর অন্তরায় থাকে না, শক্তির সঙ্গে মূল সংযোগ ঘটে। বর্তমানে বাইরের জগতের সঙ্গে আপনার যে সংযোগ, তা মূলত আপনার শরীর, মন এবং আবেগের মাধ্যমে। এভাবেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে, মানুষের কাছে যাওয়া যায়। আপনি কাউকে শারীরিকভাবে স্পর্শ করতে পারেন বা চিন্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা আবেগের মাধ্যমে কিছু প্রকাশ করতে পারেন; কিন্তু যখন আপনি প্রকৃত প্রাণবন্ত হয়ে উঠবেন, এই অস্তিত্বের সমস্ত কিছুর সঙ্গে আপনি শক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবেন। যখন আপনি শক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করবেন, তখন আর এটা বা ওটার মধ্যে কোনো তফাত থাকবে না। একবার যখন এই বাধা ভেঙে যায়, সেটাই হলো পরম অবস্থা।
যখন আপনি কোনো আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া শুরু করেন, প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার অর্থ হলো সমস্ত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা, কারণ শক্তির মধ্যেই একাত্মতা রয়েছে। পার্থিব শরীরে একাত্মতা কখনোই সম্ভব নয়। মনের চিন্তায় কখনো একাত্মতা আসবে না। আমরা একাত্ম হওয়ার কথা মুখে বলতে পারি; কিন্তু তা কখনোই ঘটবে না। আবেগের মাধ্যমে আমরা মনে করতে পারি যে, আমরা একাত্ম; কিন্তু তবুও আমরা পৃথক। কোনো দুই জন মানুষ একেবারে একইরকমভাবে অনুভব করতে পারেন না। আপনি সেরকম ভাবতেই পারেন; কিন্তু আপনার যদি সামান্য বিচারবুদ্ধিও থাকে, কম সময়েই আপনি বুঝতে পারবেন যে সেটা হয় না। কিছু মানুষের অনেক বছর লেগে যায় এটা বুঝতে; কম সংখ্যক মানুষই শীঘ্র বুঝতে পারেন; কিন্তু প্রত্যেকেই বুঝবেন। কোনো দুই জন মানুষ শারীরিক, মানসিক বা আবেগগত ভাবে পুরোপুরি এক হয় না, এটা সম্ভব নয়; কিন্তু যখন আপনি সত্যিকারের প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন, তখন একাত্ম হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এটা এরকমই।
n সৌজন্যে :ঈশা ফাউন্ডেশন
