‘দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা যাবে’
এনামুল হক, খুলনা অফিস
নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য মেরিটাইম সংস্থার জাহাজ, সাবমেরিন, টাগবোট, পন্টুন ও জেটি নির্মাণের জন্য রাবার যন্ত্রাংশ আর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না। আগে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এসব রাবার যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। দেশে এই প্রথম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে স্থাপন করা হয়েছে রাবার যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রাবার যন্ত্রাংশ রপ্তানিরও পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড সূত্র জানায়, ১৯৫৭ সালে খুলনা মহানগরীর রূপসা নদীর তীরে ৬৮ দশমিক ৯৭ একর জমিতে খুলনা শিপইয়ার্ড গড়ে উঠলেও বিভিন্ন কারণে আশির দশকে তা রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়। ১৯৯৯ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মৃতপ্রায় খুলনা শিপইয়ার্ডকে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বদলে যেতে থাকে এই শিপইয়ার্ড। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সঠিক তদারকির কারণে ধীরে ধীরে এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০১৩-১৪ সাল থেকে যুদ্ধ জাহাজসহ সব ধরনের জলযান তৈরিতে পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জন করে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড। কিন্তু এসব যুদ্ধ জাহাজসহ সামুদ্রিক জলযানের জন্য প্রয়োজনীয় রাবার আইটেম ও খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য মানসম্পন্ন কারখানা না থাকায় সঠিক সময় ও গুণগত মানসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণ ব্যাহত হচ্ছিল। এ ছাড়া বিদেশ থেকে এসব রাবার যন্ত্রাংশ আমদানি করতে সময়ক্ষেপণ ও বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো।
এ অবস্থা নিরসনে গত ১৬ জানুয়ারি শিপইয়ার্ডের বাউন্ডারির মধ্যে ৫০ হাজার বর্গফুট আয়তনের জায়গায় রাবার যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডসহ মেরিটাইম সংস্থাগুলোর জাহাজ তৈরিতে এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশি রাবারের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও কাঁচামাল (রাবার) আমদানি করা হচ্ছে।
সূত্র মতে, খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দর, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসিসহ সরকারি সংস্থা, বেসরকারি শিপইয়ার্ডসহ সব সংস্থার রাবার আইটেমের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ভবিষ্যতে বিদেশেও রাবার যন্ত্রাংশ রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (ডিজাইন ও প্ল্যানিং) ক্যাপ্টেন এম শহীদুল্লাহ আল ফারুক জানান, কারখানাটি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। শুধু নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড বা মেরিটাইম সংস্থার জন্যই নয়, প্রাইভেট যে কোনো প্রতিষ্ঠান যাদের রাবার আইটেম প্রয়োজন তারা যোগাযোগ করলে এখান থেকে তা তৈরি করে দিতে পারব। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো রাবার যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করলে যে খরচ পড়বে সেই মানের রাবার যন্ত্রাংশ এখান থেকে প্রায় অর্ধেক দামে সরবরাহ করা সম্ভব। বিষয়টি অবহিত করে যেসব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে রাবার যন্ত্রাংশ আমদানি করে তাদেরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
খুলনা শিপইয়ার্ডের রাবার প্রোডাকশন বিভাগের অফিসার ইনচার্জ লে. কমান্ডার সাঈদ আহমেদ সাদী জানান, কারখানায় সর্বাধুনিক সব যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে নিজস্ব ডিজাইন হাউজ, অত্যাধুনিক মেশিন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রেস ও পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি। এছাড়াও রয়েছে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রকৌশলীসহ দক্ষ কর্মী। এখানে তিনটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রথমত কাঁচামালের মান নিশ্চিত করা হয়, দ্বিতীয়ত সেমি ফিনিশড প্রোডাক্টের মান নিশ্চিত করা হয়, এরপর উত্পাদিত পণ্যেরও মান পরীক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই রাবার যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে।
খুলনা শিপইয়ার্ডের জেনারেল ম্যানেজার (ডিজাইন ও প্ল্যানিং) ক্যাপ্টেন এম শহীদুল্লাহ আল ফারুক জানান, কারখানাটি বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার রাবার যন্ত্রাংশ তৈরি করতে সক্ষম। যদি অর্ডার বেশি পাওয়া যায় তাহলে এখানে কারখানা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও এখান থেকে রাবার যন্ত্রাংশ কিনতে পারবে। কারখানায় পূর্ণমাত্রায় উত্পাদন সম্ভব হলে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানেরই আর বিদেশ থেকে রাবার যন্ত্রাংশ আমদানির প্রয়োজন হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
