উত্সবে ঐতিহ্যের ঢাক

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২৬

সৈয়দপুর সংবাদদাতা

 

মহরমে শিয়া সম্প্রদায় ও পূজা পার্বণে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঢাক ছাড়া চলে না। ফলে এই দুই সময় ছাড়াও ঢাক তৈরি ও মেরামত কাজে ব্যস্ত থাকেন কারিগররা। চলে দিনরাত সমানতালে কাজ। এ কারণে ঢাকের বাজারও থাকে অনেকটা চাঙা। প্রতীকী কারবালাকে কেন্দ্র করে ইমামবাড়ায় প্রায় ১০ দিনই বাজে ঢাক। পূজার আরতি ও মন্ত্রপাঠের সময় ঢাক ও ঢোলের বিকল্প নেই। ঢাক-ঢোলের বাদ্য ছাড়া পূজার উত্সব যেন অপূর্ণ থাকে। তবে উত্সবকে প্রণোদনা এনে দেওয়া এই ঢাকের কারিগরদের জীবন কাটছে চরম দুর্দশায়।  

নীলফামারীর ঢাকি পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, ঢোল তৈরিতে কারিগররা দেশীয় আম, জাম, রেইনট্রি কড়াই ও মেহগণি কাঠ ঢাকের ছাউনির জন্য এবং ছাগল, ভেড়া ও মহিষের চামড়া বেড়ি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকেন। তবে এ বছর চামড়ার দাম সহনীয় পর্যায় থাকলেও কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এ শিল্পের কারিগররা।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। তাই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না পেরে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।

এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় ২শ’ ৬০টি পরিবার ঢোলের কারিগর হিসেবে নিয়োজিত আছেন। এরমধ্যে সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাহালীপাড়া গ্রাম ও রামনগর বাসার বাড়ি বেহারাপাড়া গ্রামে ৫০টি পরিবার ঢাক-ঢোল, দোতারা, ডুগি-তবলা, খোল, খঞ্জনি, একতারাসহ নানা প্রকার বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামত করে থাকেন। এছাড়া সৈয়দপুর, ডোমার ও অন্যান্য স্থানেও ঢাক তৈরির কাজ করা হয়।

বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ঢাক, ঢোল ও খোল দেশের চাহিদা মিটিয়ে এক সময় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হতো। সীমান্তবর্তী এলাকায় নীলফামারী জেলার অবস্থান হওয়াতে ভারতে এসব বাদ্যযন্ত্রের কদরও ছিল প্রচুর।

বর্তমানে ঢোলের কারিগরদের দুর্দশা নিয়ে জেলা শহরের গাছবাড়ী ডালপট্টি এলাকার ঢোলের কারিগর হিসেবে ৩৫ বছর কাজ করা সাগর চন্দ্র দাস বলেন, ‘আগে একটি ঢোল বিক্রি হতো ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায়। আর বর্তমানে এ ঢোল বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে বাজার সয়লাব। এক সময় ভালো অবস্থা থাকলেও বর্তমানে এ পেশায় সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ তো দূরের কথা দু-বেলা দু-মুঠো ডাল-ভাতই জোটে না কপালে। জোটে না পূজা-পার্বণে ছেলেমেয়ের জন্য কোনো নতুন কাপড় কিংবা মিষ্টিমুখ করার মতো টাকা-পয়সা।’ তবে এ পেশায় আগ্রহ হারালেও পূর্বপুরুষের পেশার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখনো এতেই নিয়োজিত রয়েছেন সাগর চন্দ্র দাস।

নীলফামারী সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালীপাড়া গ্রামের সুবাস ঋষি বলেন, ‘এক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাজের অর্ডার আসতো। কিন্তু এখন আর তেমন কাজের অর্ডার আসে না। বর্তমানে মহরমের জন্য ঢাক মেরামত তৈরির কিছু কাজ পেয়েছি।’ এরপর শুরু হবে দুর্গাপূজার ঢাক তৈরির কাজ।

সৈয়দপুরে ঢাক ও বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগর নিতাই চন্দ্র জানান, সৈয়দপুরে মহরম জাঁকজমকভাবে পালন করেন শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন। ফলে ঢাকের চাহিদাও থাকে প্রচুর। অতিরিক্ত লোক নিয়ে ঢাক তৈরির কাজ চলছে।

এ বিষয়ে জেলা শহরের হাড়োয়া দুর্গা মণ্ডপের পুরোহিত মহেষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘ঢাকের বোলে জগত্ জননী মায়ের পূজা আনন্দময় হয়ে ওঠে। পূজায় ষোলকলা পূর্ণ করতে ঢাক বা ঢোলের কোনো বিকল্প নেই।’ এদিকে মন্দিরের ঢাকি হূদয় ঋষি বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই প্লাস্টিকের তৈরি ঢাকের মধ্যে ছাউনি দিয়ে পূজার কাজ চালিয়ে নিতে যাচ্ছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো দিনের এ সব ঢাক-ঢোলসহ আরো অনেক ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।’

নীলফামারী স্বর্ণালি সুর সংগীত একাডেমির সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, ‘আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দাপটে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র এখন প্রায় বিলুপ্ত। এগুলো বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন।’

আগের দিনে ঢোল, ডুগি-তবলা, হারমোনিয়াম ছাড়া গানের আসরই জমতো না। তবে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। যদিও এখনো মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় এসব দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। তবে এসব দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের যে কারিগর তারাই আজ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। তারা দিন কাটাচ্ছেন নিদারুণ কষ্ট আর দুর্দশায়।

আশ্বাস অনেক থাকলেও এখনো চরম দুর্দশাতেই দিন কাটাচ্ছেন নীলফামারীর এসব ঢাকের কারিগরেরা। তবে এই কারিগররা বাঁচলে হয়তো বেঁচে থাকবে হাজার বছর ধরে চলে আসা বাঙালির এই ঢাক-ঢোলের ঐতিহ্য।