পাখির গ্রাম আলী দেওনা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২৬

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ

 

নওগাঁর মহাদেবপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত গ্রাম আলী দেওনা। বাঁশ ও গাছে গাছে হাজার হাজার পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে আলী দেওনা গ্রামটি। মহাদেবপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে খাজুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই গ্রাম। কিন্তু এই গ্রামের রাস্তাসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত দিকে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। তবে এখানে গড়ে ওঠা বিভাগের বৃহত্তম পাখির অভয়ারণ্যকে জাতীয়ভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার দাবি স্থানীয়দের।

জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে হঠাত্ করে এই গ্রামের বাঁশঝাড়সহ বিভিন্ন বড় বড় গাছে আসতে শুরু করে নানা প্রজাতির পাখি। আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে পাখি কলোনী। গ্রামের সাধারণ মানুষের উদ্যোগে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল। এখানে আশ্রয় নেওয়া হরেকরকম পাখির মধ্যে রয়েছে লাল বক, সাদা বক, শামুকখোল, রাতচোরা, সারস, মাছরাঙা, পানকৌড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির ঘুঘুসহ নাম না জানা নানা রঙয়ের হাজার হাজার পাখি। গ্রামের আনাচে-কানাচে বেড়ে ওঠা বাঁশ ও গাছে গাছে সারাক্ষণ হাজার হাজার পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকে গ্রামটি। এ কারণে বর্তমানে আলী দেওনা গ্রামের নাম হয়েছে পাখির গ্রাম।

পাখির গ্রামে গেলেই মুগ্ধ হয়ে উঠে নওগাঁ জেলাসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলার পর্যটকরা। স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে গ্রামটিকে পাখি শিকার মুক্ত এলাকা ঘোষণা করেছেন। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার পাখির বাস। গ্রামের সীমানায় কোনো পাখি প্রবেশ করা মানে পাখিটি নিরাপদ। আর এ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন গ্রামের সকলেই। পাখি শিকার রোধে গ্রামবাসী নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। ফলে সারাবছরই সেখানে হাজার হাজার পাখির আগমন ঘটে। বিশেষ করে বাচ্চা দেওয়ার মৌসুমে পাখিদের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে গ্রামটিতে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে।

তবে গ্রামের অবকাঠামোগত অবস্থা খুব ভালো নয়। গ্রামটিতে প্রবেশের সময় দেখা যায় সরু রাস্তার দু-ধারে থাকা গাছে গাছে লাগানো রয়েছে বিভিন্ন পাখির আদলে সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডগুলোতে পাখি শিকার রোধে বিভিন্ন আইন ও সচেতনতামূলক উপদেশ লেখা রয়েছে। ‘পাখি শিকার করবেন না, পাখি মারবেন না, পাখিরাও আমাদের মতো বাঁচতে চায়, পাখি এ সমাজের পরম বন্ধু, তাদের আগলে রাখতে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে’ ইত্যাদি। আর এ কাজে গ্রামের মানুষদের এক কাতারে এনে প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করছেন স্থানীয় আলী দেওনা পাখি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি নির্মল বর্মণ। সেখানে পাখির খেলায় যেন মেলা বসে। পাখিদের মেলার কারণে গ্রামটিও যেন ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ। নতুন প্রাণের স্পন্দনে জেগে ওঠা গ্রামবাসী পাখিদেরও আগলে রেখেছেন আপন সন্তানের মতোই। ইচ্ছাকৃতভাবে না হোক, কোনো শিকারি ভুলক্রমেও এ গ্রামে প্রবেশ করলেও তার কপাল মন্দ।

আলী দেওনা পাখি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত নির্মল বর্মণ বলেন, ‘পাখিদের প্রতি আলী দেওনা গ্রামের মানুষের ভালোবাসার কারণেই এখানে পাখিদের আবাসভূমি গড়ে উঠেছে। তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বা অন্য কোনো কারণে বাসা থেকে পড়ে যাওয়া বাচ্চাগুলোকে যত্নসহকারে মা পাখির বাসায় তুলে দেয়। কিন্তু পাখি ঘেরা এই এলাকার রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই বেহাল। বর্ষা মৌসুমে পর্যটকরা রাস্তার কারণে গ্রাম ঘুরে পাখি দেখতে পারেন না। নেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের বসার কোনো স্থান। পাখিদের পায়খানা পরিষ্কারের নেই কোনো ব্যবস্থা। যার কারণে পাখির পায়খানার বিষক্রিয়ায় নানা সমস্যা সৃষ্টি ও ক্ষতি হচ্ছে অন্যান্য গৃহপালিত পশু-পাখির। এতে করে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয় এখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের। এই পাখির অভয়ারণ্যে আরো বেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজন অনেককিছুই। আর প্রয়োজন কর্তাব্যক্তিদের সুদৃষ্টি। কারণ কর্তাব্যক্তিরা আশ্বাস দিতে পছন্দ করেন, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকে না তাদের। যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর যাবত্। আমি দীর্ঘসময় থেকে এই সমস্যাগুলো সরকারের বিভিন্ন মহলকে জানিয়েও আজ পর্যন্ত কোনো উপকার পাওয়া যায়নি।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, ‘জেলার আলঅ দেওনা গ্রামটি ঐতিহ্যবাহী পাখি গ্রাম হিসেবে সারাদেশের মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছে। পাখির অভয়ারণ্যসহ গ্রামটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করছি।’