একজন কারুশিল্পীর গল্প

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২৬

মো. আমিরুজ্জামান

 

বাঁশের কারুশিল্পী ধরঞ্জয় রায় ওরফে ডাকো সাধু। এক নামে সবাই চেনেন ও জানেন। এক সময় ঘরের ছাউনি, বেড়া বাঁধা, যা আঞ্চলিক ছাপার বান বলে পরিচিত সেই কাজ করে সংসার চালিয়েছেন তিনি। কখনো পেটচুক্তিতে, কখনো না খেয়ে সংসারের ঘানি টেনে গেছেন। এখন তিনি বাঁশের একজন কারুশিল্পী। বাঁশ দিয়ে তৈরি করেন দৃষ্টিনন্দন সব শিল্পকর্ম।

বাঁশের তৈরি পণ্যের জিনিসপত্র বানিয়ে সকলের দৃষ্টি কেড়েছেন কারুশিল্পী ধনঞ্জন রায়। নীলফামারী সদরের পলাশবাড়ি ইউনিয়নের খলিসাপচা গ্রামের বাসিন্দা ডাকো সাধু। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে মানুষের খড়ের ঘর ছাউনি, বেড়া বাঁধা আর ছোটখাটো মেরামতের কাজ করেই জীবন ও জীবিকা চলতো। নিজের ভিটে ছাড়া কোনো জমি ছিল না।

সংসারে স্ত্রী ও তিন ছেলে নিয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে মিতালি করেই জীবিকানির্বাহ করতেন তিনি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ যুবক ধনঞ্জন রায় প্রত্যক্ষ করেন। যুদ্ধে পাকসেনাদের বর্বরতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের দেশপ্রেমে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে বাঁশের  তৈরি জিনিসপত্র তৈরিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ধনঞ্জয়ের স্ত্রী, তিন ছেলে ও নাতি-নাতনি নিয়ে অভাবের সংসার ভালোই কাটছিল। হঠাত্ একদিন বাবার আধ্যাত্মিক মোহ জেগে ওঠে তার মনেও। এতে একদিন পরিবারের কাউকে না বলে সমাজ সংসারের দায়বদ্ধতা ভুলে নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি। বিভিন্ন মন্দির, মসজিদসহ বন-জঙ্গলে কাটান দীর্ঘ ৮ বছর।

কিন্তু কী মনে করে আবার একদিন নতুন পরিচয় ‘ডাকো সাধু’ নামে স্ত্রী সন্তানের মায়ায় ফিরে আসেন সংসার জীবনে। পুনরায় শুরু করেন বাঁশের কাজ। তবে দীর্ঘদিন না থাকায় এবং সাধু হওয়ায় মানুষ তাকে কাজে ডাকতেন না। অফুরন্ত অবসর সময়ে ডাকো সাধু বাঁশ দিয়ে আগের সেই শখ বিভিন্ন শৈল্পিক জিনিসপত্র তৈরি শুরু করেন। তার শৈল্পিক কারুকার্য দেখে অনেকেই মুগ্ধ হয়ে তাকে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করতে বলেন। কেউ সামান্য টাকা দিয়ে তা কিনে নেন। আবার অনেকে তৈরি করতে বলেও আর কিনে নেন না।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, পাকসেনাদের বর্বরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, নীলফামারীর ঐতিহ্য, স্মৃতিসৌধ, নিয়াজীর আত্মসমর্পণের টেবিল, বঙ্গবন্ধু সেতু, সুখী সংসার, গ্রামীণ ঐতিহ্য ইত্যাদি বাঁশ দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করেন তিনি। কাজ ও শ্রমের ওপর নির্ভর করে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয় বলে জানান তিনি। এসব বাঁশের তৈরি কারুশিল্প নিজবাড়ি থেকেই বিক্রি করেন তিনি। কেউ কেউ অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নেন। মাঝেমধ্যে মেলা হলে সেখানে এসব কারুশিল্প নিয়ে হাজির হন ডাকো সাধু। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার দুই ছেলে।

এভাবেই তার বাড়ি ভরে যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য, মুক্তিযোদ্ধা, পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, নৌকা, মাঝি, গাঁয়ের বধূ, মত্স্যকন্যা, বাঘ, হরিণ, কুমির ও পাখিসহ বিভিন্ন কারুকার্যে। ভাঙা বাড়িতেই যত্রতত্র পড়ে থাকে এসব শৈল্পিক কাজ। তার তৈরি এসব শিল্পকর্ম দেখতে এলাকার জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপি, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা তার বাড়িতে যান। তবে ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি তার।

ডাকো সাধু বলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বাঁশের কাজ করে যাচ্ছি। আমার তৈরি অনেক শিল্পকর্ম দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়। কিন্তু আমার অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। পরিবারের কারো জন্য কিছু করতে পারি না। অনেক বড় বড় লোক আমার বাড়িতে এসে অনেককিছু দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেননি, কেউ কিছু দেননি। অর্থের অভাবে এখন নতুন কোনো জিনিস তৈরি করতে পারি না। কিছু আর্থিক সহায়তা পেলে আমি আরো অনেককিছু তৈরি করতে পারতাম।’