দেবব্রত মুখোপাধ্যায়‑
আফতাব আহমেদের পরিচয় কী?
কার্ডিফে জেসন গিলেস্পিকে উড়িয়ে মারা সেই ছক্কা। অজিত আগারকার, জহির খানদের তুলোধোনা করা। কিংবা ক্যারিয়ারের প্রথমবার বল করতে নেমেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট তুলে নেওয়া।
না, এসব আর এখন আফতাব আহমেদের ‘সিননেচার ওয়ার্ক’ নয়। শ্মশ্রুমণ্ডিত আফতাব এখন ধীরস্থির, শান্ত মাথার একজন সফল কোচ। সেই মারকুটে আফতাবকে চট্টগ্রামে এখন ঘিরে রাখে কিচমিচ করতে থাকা শিশুরা। আবার সেই আফতাবই ঢাকার ক্রিকেটে এখন লিগ কাঁপানো এক কোচ।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে আফতাব ছিলেন এক অল্পবয়সি প্রতিভা এবং প্রবল দর্শকপ্রিয় চরিত্র। স্বল্পমেয়াদী ক্যারিয়ারে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে চার-ছক্কা মেরে দর্শকের ভালোবাসা কম পাননি। কিন্তু মাত্র ২৪ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। বয়স তিরিশ স্পর্শ করার আগে সব ধরনের ক্রিকেট ছেড়ে কোচিং শুরু করেন।
ঢাকার ক্রিকেটে তিন বছর মোহামেডানের সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর গত মৌসুমে হয়েছিলেন লিজেন্ড অব রূপগঞ্জের প্রধান কোচ। প্রথম মৌসুমেই দলকে রানার্সআপ করেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামে চালাচ্ছেন ‘আফতাব আহমেদ ক্রিকেট একাডেমি’। একাডেমির সাফল্যের কারণে এ বছরই তার দ্বিতীয় শাখা চালু করতে হয়েছে।
আফতাব বলছিলেন, কোচিংয়ের এই জীবনটাকে দারুণ উপভোগ করছেন তিনি। ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের উত্তাপ উপভোগ করছেন। তার চেয়েও বেশি উপভোগ করছেন শিশুকিশোরদের নিয়ে পথচলা, ‘কোচিং ব্যাপারটা খুব উপভোগ করছি। দুই জগতেই কাজ করাটার দারুণ অভিজ্ঞতা। ঢাকা লিগে খুব উত্তেজনা আছে, কিছু করার চাপ আছে। কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে বেশি ভালো লাগে। ওরা যেভাবে আমার অভিজ্ঞতা শুনতে, গল্প শুনতে আগ্রহ দেখায়, সেটা খুব আনন্দ দেয়। একটা বাচ্চা আমার এখানে এসে তার ক্রিকেট জীবনের শুরু করছে, এটাই তো বড়ো একটা প্রাপ্তি।’
আফতাবের এই বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করাটা যে সফল হচ্ছে, সেটা তার একাডেমির প্রসারণ দেখেই বোঝা যায়। সফল তিনি ঢাকার ক্রিকেটেও। মোহামেডান ছেড়ে গত মৌসুমে এসেছেন রূপগঞ্জে। প্রথম অভিযানে রানার্সআপ হয়েছেন—এটা বললে সাফল্যটা ঠিক বোঝা যায় না। মৌসুমের শেষ দিনে এসে আসলে চ্যাম্পিয়নশিপ হারিয়েছেন। শেষ ম্যাচে এসে আবাহনীর সমান পয়েন্ট নিয়েও রানার্সআপ হয়েছেন হেড টু হেড বিচারে।
এভাবে শিরোপা হারানোর আফসোস আছে আফতাবের। তবে তিনি সাফল্যটাই মনে রাখতে চান, ‘আমরা আবাহনীর চেয়ে চার পয়েন্ট এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু শেষদিকে সেটা ধরে রাখতে পারিনি। এটা অবশ্যই হতাশার। তারপরও আমাদের দল যে লড়াইটা করেছে, তাতে আমি খুব খুশি। আশা করি, আগামী মৌসুমে আমরা পরিশ্রমের ফল পাব।’
প্রথমবারের মতো প্রধান কোচ হয়েই এই সাফল্য পাওয়া সোজা কথা নয়। কিন্তু আফতাব নিজে এই কৃতিত্ব নিতে মোটেও রাজি নন। তিনি দলের কৃতিত্বই দেখছেন, ‘আমাদের দলটায় খুব বেশি তারকা ছিল না। কিন্তু দলের খেলোয়াড়রা এতটা কমিটেড ছিল যে, আমি নিজেই অবাক হয়ে গেছি। সিনিয়রদের দারুণ কমিটমেন্ট দেখে জুনিয়ররাও নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে। এমনকি যারা একাদশের বাইরে ছিল, তারাও খুব সিরিয়াস ছিল।’
কথাবার্তাই বলে দিচ্ছে, আস্তে আস্তে পেশাদার কোচ হয়ে উঠছেন আফতাব। তাহলে আফতাবকে কী আরেকবার জাতীয় দলে দেখা যেতে পারে কোনোদিন?
প্রশ্নটা শুনে আফতাব একটু হাসলেন। স্বপ্নটা দেখেন বলেই বললেন, ‘দেখুন, আমার একাডেমিতে ছোট্ট যে বাচ্চাটা আসে, সেও জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখে। আমি যখন কোচিং করাচ্ছি, অবশ্যই জাতীয় দলে কোচিং করানোর স্বপ্ন দেখি। তবে আমার তাড়াহুড়ো নেই। শিখছি, এগোচ্ছি। এভাবে এগোতে থাকলে হয়তো একদিন স্বপ্ন পূরণ হবে।’
তাই হোক। আবার জাতীয় দলের জার্সি উঠুক আফতাবের গায়ে।
