অনল কুমার দে, শরীয়তপুর প্রতিনিধি
পদ্মা নদী থেকে কীর্তিনাশা মাঝখানে ৩৩ কিলোমিটার নদী। নদীটির এক অংশের নাম নাওডোবা ও আরেক অংশের নাম মরাকীর্তিনাশা। শরীয়তপুরের জাজিরা ও সদর উপজেলার মধ্যদিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়েছে। দখল ও ভরাট হওয়ায় মৃতপ্রায় নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে খননের উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু ঐ নদীর দুই কিলোমিটার এলাকা ব্যক্তিগত দাবি করে মামলা করা হয়েছে। মামলার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে খনন কাজ।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে পদ্মা নদীটি শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা ও পালেরচর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে নড়িয়া উপজেলার দিকে প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু ৮৬ বছর আগে নদীটির একটি ধারা আরো দক্ষিণ দিক দিয়ে জাজিরার কাজীরহাট বন্দরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। ১৯৩৩ সাল থেকে এ স্থানে চর পড়তে শুরু করে। আস্তে-আস্তে ঐ এলাকা দিয়ে চর পড়ে নদী সংকুচিত হয়ে যায়। তখন পদ্মা নদী কাজীরহাট থেকে নাওডোবা পর্যন্ত সাড়ে ১২ কিলোমিটার অংশ নাওডোবা নদী নামে পরিচিতি পায়। আর কাজীরহাটের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল কীর্তিনাশা নদী। ঐ নদীটিতেও আস্তে আস্তে চর পড়তে থাকে । দীর্ঘ এ সময়ে ঐ সকল চরে জনবসতি, হাট-বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠে। নদীটি সংকুচিত হয়ে যায়। তখন নদীটি কাজীরহাট থেকে সদর উপজেলার মুন্সিরহাট পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এলাকা মরাকীর্তিনাশা নদী নামে পরিচিতি পায়।
নদীটির ঐ দুটি অংশের বিভিন্ন স্থানে দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। গতবছর কীর্তিনাশার সদর উপজেলার উপরগাঁও এলাকা দিয়ে দুই কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। ঐ খনন কাজে ব্যয় করা হয়েছে ২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর কাজীরহাট থেকে নাওডোবা পর্যন্ত ১২ দশমিক ৩ কিলোমিটার নদী খননের জন্য গত মার্চে দরপত্র আহবান করা হয়। খননের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পাউবো থেকে গত ১৮ জুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এন এইচ ও জেবিকে যৌথ মালিকানায় কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গত ৩০ জুন কাজীরহাট এলাকার ডুবিসাহেবের মৌজায় নদী খনন কাজ করতে গেলে স্থানীয় কিছু মানুষ বাধা দেয়। ঐ এলাকার ফজলুল হক হাওলাদার ঐ নদীর ১৬ দশমিক ৩৫ একর জমি নিজেদের দাবি করে ২ জুলাই জাজিরা সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। মামলায় পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীকে আসামি করা হয়েছে।
কাজীরহাট বন্দরের ব্যবসায়ী তোতা মিয়া মোল্যা বলেন, জাজিরা, নড়িয়া, সদর, পাশের শিবচর, কালকিনি ও মাদারীপুর সদর উপজেলার অন্তত ২০টি বন্দরের ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে এই নদীটি ব্যবহার করে। নদীটি দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমের দুই মাস ছোটো নৌকা চলতে পারে। গত ১০ বছর যাবত্ কোনো ভারী নৌযান চলাচল করতে পারে না। কিন্তু ভারী নৌযান চলাচল করতে হলে খনন করা প্রয়োজন।
ডুবিসাহেবের এলাকার ফজলুল হক হাওলাদার বলেন, ৮৫-৮৬ বছর আগে এখানে নদী ছিল। তখন আমাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। আবার কয়েক বছর পর তা জেগে উঠেছে। কিন্তু ঐ জমি কখনো খাস খতিয়ানভুক্ত হয়নি। আমরা সবসময় খাজনা পরিশোধ করে রেখেছি, চাষাবাদ করেছি। এখন এখানে নদীটি খনন করার প্রয়োজন হলে আমাদের জমি অধিগ্রহণ করে নিতে হবে। এ কারণে মামলা করেছি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মতিউর রহমান মামুন বলেন, কার্যাদেশ পাওয়ার পর নদী খনন করার কাজ করতে ডুবিসাহেবের এলাকায় যাই। কিন্তু ঐ এলাকার মানুষ নদীর জায়গা নিজেদের দাবি করে বাধা দেয়। মামলা ও ঐ এলাকার মানুষের হামলার ভয়ে নদীর খনন কাজ বন্ধ রেখেছি। ২০২০ সালের নভেম্বরের মধ্যে খনন কাজটি শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। এখনই শুরু করতে না পারলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করা যাবে না।
শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকার বলেন, সবগুলো মৌজার নকশায় নদী রয়েছে। কিন্তু ডুবিসাহেবের মৌজা নকশায় নদীর অস্তিত্ব নেই। বিষয়টি রহস্যজনক, আমরা জেলা প্রশাসনের সহায়তায় খতিয়ে দেখব। যেহেতু মামলা হয়েছে। তাই বিষয়টি আইনগতভাবেই মোকাবেলা করা হবে।
