কুশিয়ারায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন
শিপন আহমদ, ওসমানীনগর (সিলেট) সংবাদদাতা
কুশিয়ারা নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রতিদিন নদী থেকে হাজার-হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করছে একটি চক্র। এতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের শেরপুর সেতুসহ অর্ধ শতাধিক গ্রামের ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। নদীতীরবর্তী ভুক্তভোগী বাসিন্দারা বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না।
স্থানীয়রা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে কুশিয়ারা নদীর বালাগঞ্জের ঐয়া ও ওসমানীনগরের আলীপুর এলাকা থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে কুশিয়ারা নদীর ওপর নির্মিত শেরপুর সেতুটি ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে সেতুর এ্যাপ্রোচ অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস আগে এই ফাটল অংশে মেরামতের কাজও করা হয়েছিল। এছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ওসমানীনগরের তাজপুর, সুরিকোণা, খছরুপুর, বালাগঞ্জ উপজেলা সদরের বালাগঞ্জ বাজার, রাধাকোণা, হামছাপুর, কিত্তে জালালপুর, জালালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নবীগঞ্জ উপজেলার পারকুল গ্রাম, পারকুল গ্রামস্থ বিদ্যুত্ পাওয়ার প্ল্যাট, শেরপুর ব্রিজের আশপাশ এলাকায় নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ফলে নদীতীরবর্তী বাসিন্দারাও আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।
গত ২৮ আগস্ট এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের নিকট বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। ঐ অভিযোগে বলা হয়েছে, কুশিয়ারা নদীর বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর অংশ থেকে বালু উত্তোলনে কোনো ইজারা প্রদান করা হয়নি। কিন্তু দীর্ঘদিন হতে মেসার্স তালুকদার এটারপ্রাইজ নামীয় প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আশরাফ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কুশিয়ারা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছেন। চলতি বছরের ২৮ মে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় ঘটনাস্থলে এক ড্রেজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আশরাফ উদ্দিন আহমদ ও তার সহযোগীদের আসামি করে ওসমানীনগর থানায় মামলা (২৪/১৯) রুজু করে। মামলা দায়েরের পরও বালু উত্তোলনকারীদের মধ্যে কয়েকজন কিছু দিন জেলহাজতে থাকায় নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আশরাফ উদ্দিনের নেতৃত্বে আবারও কুশিয়ারা নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করায় চলতি বছরের বন্যায় কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঙে উপজেলার শাতাধিক গ্রাম তলিয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ করেও তারা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে ঐয়া গ্রামের বাসিন্দা ফিরুজ মিয়া, খছরু মিয়া, আলীপুর এলাকার মানিক মিয়াসহ নদীপাড়ের একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও পরিবেশ ধ্বংসকারী প্রভাবশালীরা ড্রেজার মেশিন দিয়ে কুশিয়ারায় অত্যাচার চালিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতে ব্যস্ত রয়েছেন। কিন্তু, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। যার কারণে প্রকাশ্যে চলছে বালু উত্তোলনের হরিলুট। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন মাঝে-মধ্যে লোক-দেখানো অভিযান পরিচালনা করে দিনমজুর লোকজনকে ধরে নিয়ে যান এবং জেল জরিমানা করেন। কিন্তু যাদের মদদে বালু উত্তোলন হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন রহস্যজনক কারণে নীরব রয়েছেন।
বালাগঞ্জের পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন, বালু উত্তোলনের ফলে নদীপাড়ের বাসিন্দারা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। যত্রতত্র বালু উত্তোলনের ফলে বিভিন্ন স্থান ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে। প্রতি বছরই মৌলভীবাজার এলাকার কিছু লোকজন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।
বালু উত্তোলনকারী আশরাফ উদ্দিন আহমদ বলেন, শেরপুর ইকোনোমিক জোন নির্মাণকাজের জন্য আমরা বালু তুলে তাদের কাছে বিক্রি করছি। ইকোনমিক জোনে বালু দেওয়ার বিষয়ে আমাদের বৈধ কাগজপত্র আছে। এলাকার কিছু মানুষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছেও আসছে। খোঁজ নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব বলেন, কুশিয়ারা নদীর বালাগঞ্জ অংশে বালু উত্তোলনে কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি ঐয়া এলাকায় বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। আবার যদি ওরা বালু উত্তোলন করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
