শুভ্র মেঘের সাজ সাজ রব

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৯

জ্যাষ্টিন গোমেজ

দুই মাস পরপরই আমাদের দেশে ঋতুর পরিবর্তন হয়। এই ঋতু পরিবর্তনের বহতায় যখন শরতের আগমন ঘটে তখন সর্বত্রই যেন সাদা শুভ্রতার এক সাজ সাজ রব বয়। কেননা শরত্ মানেই নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা। শরত্ মানে আকাশের গায়ে যেন মেঘ তুলোর ওড়াউড়ি! কখনো সাদা, কখনো কালচে রূপ ধারণ করে শরতের আকাশে ভাসা ভাসা মেঘের দল।  আর এই সময়টা ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায় শরতের আকাশ। নীল আকাশে সুতো-নাটাইহীন সাদা ঘুড়ির মতো দিনভর উড়ে বেড়ায় মেঘের দল। গোধূলিলগ্নে সোনারঙে রঙিন হয়ে ওঠে আকাশ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেঘের সঙ্গে সূর্যের লুকোচুরিতে শরতের মায়াময় প্রকৃতি সাজে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। শরত্ মানেই নদীর তীরে কাশফুল। শরত্ মানেই গাছে গাছে হাসনুহানা আর বিলে শাপলার সমারোহ। শরত্ মানেই গাছে পাকা তাল। সেই তাল দিয়ে তৈরি পিঠা, পায়েস। আর খেতে খেতে আমন ধানের বেড়ে ওঠা চারা। বাংলার প্রকৃতিতে শরতের আবির্ভাব প্রতিনিয়তই মুগ্ধ করে আমাদের। তাই তো শরতের বন্দনায় আপ্লুত হয়ে জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম লিখেছেন: ‘কাশফুল মনে সাদা শিহরণ জাগায়, মন বলে কত সুন্দর প্রকৃতি, স্রষ্টার কি অপার সৃষ্টি।’ শরতের আর এক রূপ, শান্ত ঠান্ডা বাতাস বাবরি চুল উড়িয়ে নিয়ে যায় বাতাসে, দোল খায় সাদা মেঘগুলো। মনে জাগরণ জাগায়। শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ! এ সময় না আছে গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ, না আছে বর্ষার অঝোর ধারার বৃষ্টি। আছে শুধু আলোকোজ্জ্বল ঝলমলে দিন, জ্যোত্স্না রাত, মৃদুমন্দ সমীরণ আর সেই সমীরণে দুলতে থাকা শুভ্র কাশবন। শরতের মন ভোলানো এই রূপ পাওয়া যাবে শুধু আমাদের বাংলার প্রকৃতিতে। আর তাই তো অনুপম রূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত শরত্ ঋতু ‘শারদলক্ষ্মী’ নামে পরিচিত। 

এখন আর নদীর দুই ধারে, জমির আইলে শরত্কালের সেই চিরচেনা দৃশ্য দেখা যায় না। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে কাশবন। এখন গ্রাম-বাংলায় বিচ্ছিন্নভাবে থাকা যে কয়টি কাশবন চোখে পড়ে সেগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে মৌসুমি ফসলের খেত। প্রকৃতির এ অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় কেবল গ্রামাঞ্চলে। তাই তো প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ছুটতে হয় ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় ছোটো কোনো গ্রামে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে গ্রামে-গঞ্জে কাশফুলের আধিক্য কমে গেছে। তাই মনে দারুণ কষ্ট মুস্তফা মনোয়ারের, তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষরা শুধু লোভীর মতো প্রকৃতির কাছ থেকে খাদ্য চাই, কিন্তু প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিছুই করি না। যেমন—আগে প্রায় প্রতিটি গ্রামে বটগাছ দেখা গেলেও এখন তেমনটা চোখে পড়ে না। মানুষ নিজের প্রয়োজনে সেগুলো কেটে ফেলেছে। অথচ আগে এই বটগাছকে কেন্দ্র করে কত উত্সব হয়েছে, বটগাছের ছায়ায় মানুষ বিশ্রাম নিয়েছে,আশ্রয় নিয়েছে কত রকম পাখি আর পোকামাকড় কিন্তু এখন আর সে সব নেই।’ ঋতু অনুসারে ভাদ্র-আশ্বিন মাস জুড়ে শরত্কালের রাজত্ব। নিকট অতীতেও দেখা যায় প্রায়। শরত্কাল এলেই গ্রাম-বাংলার ঝোপঝাড়, রাস্তা-ঘাট ও নদীর দুই পাড়সহ আনাচে-কানাচে কাশফুলের মনমাতানো নাচানাচি। কাশবনের ফুলগুলো দোল খেতো বাতাসে। গলাগলি হতো একটার সঙ্গে আর একটার। এ সময় অজান্তেই মানুষের মনে ভিন্ন রকম আনন্দের ঝিলিক বয়ে যেত।

মনে রাখতে হবে, শরত্ হচ্ছে চমত্কার মেঘের ঋতু ও স্পষ্টতার ঋতু। কেননা শরতের আকাশ থাকে ঝকঝকে ও তকতকে পরিষ্কার। এই মেঘের ঋতু শরেক বলা হয় শুভ্রতা ও স্বচ্ছতার প্রতীক। আর এই শুভ্রতা মানুষের মনকে করে পবিত্র ও প্রশান্ত। তাই তো ঋতু বা প্রকৃতির কাছে শুধু চাইলেই হবে না, নগরায়ণের প্রভাব থেকে একে রক্ষায় দায়িত্ব নিতে হবে সবাইকে সমানভাবে। আমাদের সবাইকে শরতের মতো শুভ্র সাদা জীবন-যাপন করতে হবে। আর এই শুভ্র সাদা মানে হলো অন্তরে পরিষ্কার থাকা। সবাইকে সমান চোখে দেখা। প্রত্যেক মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করা। তাদের কাজের যথাযথ কদর করা। মনের  ভেতর থেকে হিংসা, দ্বেষ, লোভ, ক্ষোভ ইত্যাদি দূরীভূত করে আমাদের  ভেতরে শরতের আগমন ঘটানো। আমাদের  ভেতর যদি সর্বদা শরত্ বিরাজ করে তবে জীবনটা দেখাবে এক অপরূপ সৌন্দর্যে। শরতের যেমনি আছে পবিত্রতা, আছে কোমলতা, আছে শুভ্রতা, আছে নির্মলতা, আছে স্বচ্ছতা আর আছে মায়াবী স্নিগ্ধতা, তেমনি তা যেন আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে বিরাজ করে।  

n লেখক :শিক্ষার্থী,  তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা