শিফারুল শেখ
ব্রেক্সিটের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের প্রধানমন্ত্রিত্ব গেছে। ভাগ্য খুলেছিল কনজারভেটিভ দলের থেরেসা মের। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু ব্রেক্সিটের জন্যই ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। ভাগ্য খুলেছে বরিস জনসনের। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তিনিও স্বস্তিতে নেই। নিজ দলের এমপিরাই কেবল বিদ্রোহী হননি, আপন ভাইও তার থেকে এখন দূরে। এমপি এমনকি মন্ত্রিত্ব থেকেও পদত্যাগ করেছেন ভাই জো জনসন। এতকিছুর পরও আশাহত নন জনসন। তবে এমপিদের পাশকৃত এবং রানির অনুমোদিত আইন অমান্য করলে তাকে জেলেও যেতে হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
পরিবারেও বিভক্তি: ব্রেক্সিট ইস্যুতে ব্রিটেনের পরিবারেও যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে, এ নিয়ে সংশয় নেই। এবার খোদ প্রধানমন্ত্রীও সেই বিভাজনের বিষয়টি মানতে বাধ্য হলেন। তার ভাই টোরি দলের ২১ বিদ্রোহীদের একজন, যারা গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। জো জানান, একদিকে পরিবারের প্রতি আনুগত্য, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থের মধ্যে টানাপোড়েনে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। বরিসও বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিষয়ে আমার ভাই আমার সঙ্গে একমত নন।
ভাইয়ের সিদ্ধান্তেও নিজস্ব অবস্থানে অবিচল প্রধানমন্ত্রী। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়াতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে পাশকৃত প্রস্তাব উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসেও অনুমোদিত হয়েছে। আজ সোমবার রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অনুমোদন পেলে সেটি আইন হিসেবে কার্যকর হবে। তা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার বরিস বলেন, তিনি ব্রাসেলসের কাছে ব্রেক্সিটের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করার চেয়ে বরং গর্তের মধ্যে মরে পড়ে থাকবেন। আজ পার্লামেন্টে আগাম নির্বাচন নিয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা। নীতিগতভাবে বিরোধীরা আগাম নির্বাচনের পক্ষে হলেও নির্বাচনের তারিখ নিয়ে সরকারের সঙ্গে মতোভেদ আছে। বরিস ১৫ অক্টোবর, অর্থাত্ ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের (সম্মেলন ১৭ ও ১৮ অক্টোবর) আগেই নির্বাচন করতে চান। অন্যদিকে বিরোধীরা সেই সম্মেলনে ব্রেক্সিট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পর ভোট চান। এক্ষেত্রে ঐকমত্য না হলে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন অসম্ভব।
জেলে যেতে পারেন বরিস: ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্টের উপপরিচালক ড. হান্নাহ হোয়াইট বলেন, পার্লামেন্টের কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী বরিসের ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসছে। তবে ব্রিটেনে কিছু সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আছে।
প্রথমত বরিস বলেছেন, তিনি পার্লামেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইইউর কাছে ব্রেক্সিটের সময় বাড়ানোর আবেদন করবেন না। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ডোমিনিক গ্রিভ সতর্ক করেছেন, প্রধানমন্ত্রী রানির অনুমোদিত আইন অমান্য করলে জেলেও যেতে পারেন। তার জন্য এটা মানা বাধ্যতামূলক। পাবলিক প্রসিকিউশনের সাবেক পরিচালক লর্ড ম্যাকডোনাল্ড স্কাই নিউজকে বলেছেন, আইন অমান্য করলে প্রধানমন্ত্রীকে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। আদালত তাকে আইন মানার নির্দেশনাই দেবে। না মানলে আদালত অবমাননার দায়ে তাকে জেলে যেতে হবে। কারণ ইতিমধ্যে বিরোধী এবং বিদ্রোহী এমপিরা আইন অমান্য করলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন।
দ্বিতীয়ত জনসন পদত্যাগ করতে পারেন। তিনি ব্রেক্সিটের সময় বাড়াতে লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনকে পাঠাতে পারেন। আর নির্বাচনে তিনি জয়ের আশা করছেন। কিন্তু হোয়াইট বলছেন, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বরিস পদত্যাগ করলেই যে করবিনকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে রানি স্বীকৃতি দেবেন তা নয়। আর নির্বাচনে বরিস হেরেও যেতে পারেন যা বিরোধীদেরই সুবিধা দেবে।
তৃতীয়ত প্রধানমন্ত্রী আগাম নির্বাচনের জন্য ‘ওয়ান লাইন বিল’ প্রস্তাব করতে পারেন। কিন্তু এখানেও বিপদ যে এমপিরা এতে সংশোধনী অর্থাত্ নির্বাচনের তারিখ পালটানোর দাবি করতে পারেন।
চতুর্থত ১৯ অক্টোবরের আগে নির্বাচন হলে এবং তাতে বরিস জিতলে পার্লামেন্টের আইন মানার প্রয়োজন হবে না। ফলে তিনি সেটি বাতিল করতে পারবেন।
পঞ্চমত প্রধানমন্ত্রী বরিস ব্রেক্সিটের মেয়াদ বৃদ্ধি চাইলেই যে অনুমোদন হবে তা নয়। কারণ ইইউর বাকি ২৭টি দেশকেই অনুমোদন দিতে হবে। ইতিমধ্যে ফ্রান্স বিরোধিতা করছে। ফলে বরিস কোনো দেশকে দিয়ে ভেটো দেওয়াতে সমর্থ হলে সফল হবেন।
