এরশাদকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেন খালেদা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:১৬

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ’৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি সাত্তার, কিন্তু সাত্তারকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এইচএম এরশাদ। আমরা তখন এটাতে বাধা দিয়ে বলেছিলাম- নির্বাচনটা হতে দিন, গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত রাখুন। খালেদা জিয়া তখনও রাজনীতিতে আসেননি। সাত্তার ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। পরে সাত্তারকে সরিয়ে খালেদা জিয়া দলের দখল নেন। ফলে এরশাদের ক্ষমতা দখলের সুযোগ আসলে খালেদা জিয়াই করে দিয়েছিলেন। এর উপহার হিসেবে খালেদা জিয়াকে বাড়ি ও নগদ ১০ লাখ টাকাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেন এরশাদ। বিএনপি কখনও জিয়া হত্যার বিচারও দাবি করেনি। বহুদিন পর জিয়া হত্যার জন্য ’৯২-’৯৪ এর দিকে এরশাদকে দায়ী করেছিলেন খালেদা জিয়া। জাতীয় পার্টির (জাপা)             প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও চলতি সংসদের প্রয়াত বিরোধীদলীয় নেতা এইচএম এরশাদের মৃত্যুতে গতকাল রবিবার সংসদে শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রেওয়াজ অনুযায়ী চলমান সংসদের কোনো সদস্য মৃত্যুবরণ করলে তার সম্মানে সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। সেই অনুযায়ী গতকাল শুরু হওয়া চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে মরহুম এরশাদের উপর শোক প্রস্তাব এনে আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদের বৈঠক আজ সোমবার পর্যন্ত মূলতবি করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তবে এরশাদের উপর আলোচনা শুরুর পর সংসদ কক্ষ ত্যাগ করতে দেখা যায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন এরশাদ। জিয়া যেভাবে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন, এরশাদও একই কাজ করেছিলেন। উচ্চ আদালত তাদের সেই ক্ষমতা দখলকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন। রায় অনুযায়ী জিয়া ও এরশাদকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলা যায় না, তাদেরকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলাও অবৈধ।

এরশাদের আত্মার মাগফিরতা কামনা করে শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, দোষে-গুনে মানুষ। অনেক কিছু বলার আছে। কারণ আমরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ছেলেমেয়েরা জানতে পারেনি আমি কোথায়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর কিছু বলতে চাই না। এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে আমাকে অনেকবার গ্রেপ্তার করা হয়, তারপরেও দেশের ও গণতন্ত্রের স্বার্থে শুধুমাত্র মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেককিছুই হজম করেছি। লক্ষ্য দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, দেশের উন্নয়ন ও বিজয়ের সুফল প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া।

তিনি বলেন, এরশাদের আমলে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলেও আমার চেয়ে তাকে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এরশাদের আমলে আমাদেরকে সভা করতে দেওয়া হয়নি, সমাবেশে সরাসরি গুলি ছোড়া হয়। ’৮৮ সালের নির্বাচনে কোনো দল যায়নি, খালেদা জিয়ার ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও কোনো দল যায়নি। জনসমর্থন না থাকলে কেউ সরকারে টিকে থাকতে পারে না, খালেদা জিয়া সেটির প্রমাণ। শেখ হাসিনা আরও বলেন, খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত। তারপরেও তাকে প্রাপ্যের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি এই সংসদ ও সরকারকে অবৈধ বলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এমপিরাও সংসদে এসেছে। আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে একথা ঠিক- এরশাদের আচার আচরণ অমায়িক ছিল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে গেলেও জিয়া সেটি সম্পন্ন করেননি। অবশ্য এরশাদ সেটা সম্পন্ন করেছিলেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে মূল নকশায় ফিরিয়ে আনতে ও মুজিব নগর নিয়েও এরশাদ কাজ করেছেন। এগুলো স্বীকার করি। এরশাদ তার আমলে গ্রেফতার হওয়া বিশ্বজিত্ নন্দীসহ অনেককে মুক্তি দিয়েছিলেন আমাদের অনুরোধে। শেখ হাসিনা আরও বলেন, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচন থেকে হঠাত্ সরে যান এরশাদ। সেইসময় রওশন এরশাদ এগিয়ে আসেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ বলেন, এরশাদ একজন জনদরদী মানুষ ছিলেন। এরশাদের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে মাফ করে দিতে তিনি সবার প্রতি অনুরোধ জানান। এরশাদের সহোদর ও জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ’৯১ এর পর এরশাদকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো সমীকরণ হয়নি। একজন ভদ্র, রুচিশীল ও রোমান্টিক মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের আমির হোসেন আমু প্রয়াত এরশাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ বলেন, এরশাদ সাহেব একজন সজ্জন মানুষ ছিলেন। সব মানুষের জীবনেই ভুল-ত্রুটি থাকে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এরশাদ সবসময় জাতির জনককে শ্রদ্ধা করতেন। এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা থাকতেও আমি তাকে দেখেছি জাতির জনককে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই সংসদে কথা বলতে। কিন্তু দুঃখজনক, জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়েছিলেন।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ’৮৮ সালের বন্যার সময় এরশাদ দিনের পর দিন, মাইলের পর মাইল কোমর পানিতে হেটেছেন। জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এরশাদ সাহেব একজন অত্যন্ত রুচিশীল ও ভদ্র মানুষ ছিলেন। দশম সংসদে রওশন এরশাদ আমাকে বিরোধী উপনেতা করার জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন। সেটির বিরোধিতা করার জন্য এরশাদ সাহেব পরবর্তীতে আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা এরশাদের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। শোক প্রস্তাবের উপর অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন- আওয়ামী লীগের শাজাহান খান, বিএনপির এমপি হারুন অর রশীদ, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি; জাপার মুজিবুল হক চুন্নু, সালমা ইসলাম, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান ও ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি প্রমুখ। পরে সংসদে উত্থাপিত শোক প্রস্তাব সর্বস্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরশাদসহ যাদের জন্য শোক প্রস্তাব আনা হয়েছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে প্রয়াতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজত করা হয়।