আত্মত্যাগ ও কারবালার শিক্ষা

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৩

যে কথা শোনা মাত্রই প্রতিটি মোমিন মুসলমানের মনও শিহরে ওঠে, ব্যথা অনুভব হয় হূদয়ে, অশ্রুসিক্ত হয় নয়ন—তাহলো সেই শোকাবহ ‘কারবালা’। যে নাম মজলুম অসহায় জনগোষ্ঠীর প্রাণে জোগায় সাহস, আপসহীন যুবকের মনে সৃষ্টি করে প্রত্যয়, এই সেই হূদয়বিদারক ‘কারবালা’। সত্য পথের যাত্রী মুমিন মুসলমানের মুখে এই নামটি যতবার উচ্চারিত হবে, যতবার হজরত ইমাম হুসাইন (রা) ও আহলের বাইতের গগনফাটা ফরিয়াদ কানে পৌঁছাবে, ততবার তাদের ধমনির গতিবেগ নবজীবন লাভ করবে।

একজন মোমিন যখন কারবালার দিকে তাকায় তখন তার মানসপটে ফুটে ওঠে, ঐ যে ফোরাতকুলে দাস্তে কারবালার দুলদুল পৃষ্ঠে রাসুল (সা)-এর কলিজার টুকরা জগজ্জননী মা ফাতিমার নয়নমণি, বিশ্ব মুসলিমের প্রাণপ্রিয় নেতা, বেহেশতের যুবকদের সর্দার ইমাম হুসাইনের (রা) মায়াময় প্রতিকৃতি। প্রিয় ইমাম তাহাজ্জুনের তাঁবুগুলোর চারিদিকে ঘুরে আসছেন আর সঙ্গী-সাথিকে জড় করে বলেছেন, হে আমার আহলে বাইত, হে আমার সঙ্গী-সাথিগণ যে যে দিকে পার পালিয়ে যাও। ইমামের এ ভাষণ শোনামাত্রই তার ভাই হজরত আব্বাস ইবনে আলী (রা) এবং হজরত জাফর ইবনে ভাইয়ের (রা) সন্তানগণসহ সকলে বলে উঠলেন—আমরা কেন এমন কাজ করব, আপনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা পালিয়ে যাবো? আল্লাহ্ যেন কখনো এমন কাজ আমাদের না করান।

সৈন্যবেষ্টিত যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি প্রাণীও ইমাম হুসাইনকে (রা) পরিত্যাগ করে গেল না। পবিত্র কারবালাই সত্যিকার ইমানদারের পরীক্ষা। দুঃখের দিনেই সত্যিকার বন্ধুর পরিচয়। একে একে সবাই শপথ করলেন এক ফোঁটা রক্ত থাকতে কেহ ইমামকে ছেড়ে যাবেন না। মাতা তার প্রাণপ্রিয়, পুত্রকে রণসাজে সাজিয়ে দিচ্ছেন, পত্নী তার প্রিয় পতির অঙ্গে যুদ্ধের পোশাক পরিয়ে দিয়ে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন। ধর্মের জন্য, সত্যের জন্য ন্যায়ের মর্যাদা রক্ষার জন্য মুসলমান যে হাসি মুখে মৃত্যুবরণ করতে পারেন, ইমাম হুসাইন (রা) ও তার অনুসারী ৭২ জন মুসলমান ‘কারবালা’ প্রান্তরে শাহাদত বরণ করে তারই অক্ষয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

নেতার প্রতি এরূপ আনুগত্য ও ভক্তি প্রদর্শন দুনিয়ার বুকে ইতিহাসের পাতায় আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারবালায় ৭২ জনের লাশ পড়ে আছে, পাষাণ সীমার বলছে—হে আমার সৈন্যগণ এসব লাশের ওপর দিয়ে ঘোড়া দাবড়িয়ে দাও। তাও আবার কেমন লাশ যে নূরানি বদনে ৩৩টি বর্শার ও ৪৩টি তরবারির আঘাত! কী নিদারুণ দৃশ্য। যে কদম চুমু খাওয়ার জন্য দুনিয়া পাগল, আজ কারবালার এ লাশ নিয়ে চলছে তাণ্ডব। মাথা মোবারক বর্শায় পাষন্ড এজিদ বাহিনী চলছে কুফার দিকে আর এদিকে শুরু হয়েছে লুটতরাজ। ইমাম হুসাইনকে (রা) কারবালা প্রান্তরে সদ্যজাত শিশুপুত্র আজগরের মর্মান্তিক মৃত্যু তাকে বিচলিত করতে পারেনি। নওশার সাজে সজ্জিত কন্যা জামাতা ও ভ্রাতষ্পুত্র নওজোয়ান কাসেমের মৃত্যু তাকে কর্তব্য কর্ম হতে বিরত করতে পারেনি।

সত্যের পরীক্ষায় জয়যুক্ত হয়ে শহিদ হলেন, কিন্তু আদর্শহীন এজিদের নিকট বায়েত গ্রহণ করতে সম্মত হননি। এজন্যই কবি গেয়েছেন ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হর কারবালা কি বাদ’

৬১ হিজরি ১০ মহররম। মরুময় ‘কারবালা’ প্রান্তরে পাপিষ্ঠ ফাসিক এজিদ অন্যায়ভাবে রাসুল করিমের (সা) প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইনকে (রা) নির্মম ও নৃশংশভাবে এই হত্যাযজ্ঞ জন্মদেয় মহাশোকের। রাসুলে খোদার বংশের ওপর সংগঠিত জুলুম, অন্যায় ও অত্যাচার-এর প্রতিবাদ যারা করবে তারাই হবে মোহাম্মদি দ্বীনের প্রকৃত অনুসারী সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী ও জিহাদি। রাসুলে করিমকে (সা) যারা প্রকৃত ভালোবাসেন ও আহলে বাইত বিশ্বাস করেন তারা তার প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ও বংশধরদের হত্যাকাণ্ডের স্মরণ ও প্রতিবাদ কেয়ামত পর্যন্ত শোকের মাধ্যমে করতে থাকবে। দ্বীনের রাসুলে খোদার আশেকান উম্মতের  ভেতর থেকেই এই প্রতিবাদী দল বের হতে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত।

n লেখক :সাজ্জাদানশীন, গড়পাড়া ইমামবাড়ি দরবার শরীফ, মানিকগঞ্জ।