মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষরণ বেশি করে বাড়ে, যখন কোনো রাজাকার তাদের সামনে দিয়ে হাঁটাচলা করে, যখন স্বাধীন বাংলাদেশের আইন প্রণয়নে অংশীদার হয় ঘাতকদের কেউ। একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন তখন কর্পূরের মতো উবে যায়। ‘কথা ৭১’ ঢাকা পদাতিকের নাটক। সেখানেও দেখা যায়, একজন মুক্তিযোদ্ধা এখনো আত্মযন্ত্রণায় ভুগছেন। কারণ যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পায়তারা করছে। ঐ মুক্তিযোদ্ধা এজন্য সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। এ ব্যাপারে তিনি কোনো দলের ব্যানারে কাজটি করেন না। একেবারে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মাঠে নামেন। তার বিশ্বাস, এ কাজে অনেকেই অতঃপর এগিয়ে আসবে। এই মুক্তিযোদ্ধা একটি সফল সমাবেশ সম্পন্ন করে বাসায় ফিরে দেখেন তার সন্তান ঘরে উচ্চ শব্দে ইংরেজি গান শুনছে। মুক্তিযোদ্ধা পিতা এজন্য বিরক্ত বোধ করেন। তিনি গান বন্ধ করে দেন। এতে ছেলে ক্ষুব্ধ হয়ে পিতার সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়। পিতা-পুত্রের এই বিতর্কের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বেরিয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই অপারেশন সার্চ লাইট নিয়ে পাকিস্তানি আর্মিরা পর্যলোচনার মাধ্যমে গণহত্যার রূপরেখা চূড়ান্ত করে। এ সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বর্বর হামলা পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। শুরু হয় গণহত্যা। এর পরের হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, লুট, সংখ্যালঘুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা সকলের কমবেশি জানা। ইতিহাস বলে কথা। সুনাগরিক হওয়ার স্বার্থেই প্রত্যেকের সঠিক ইতিহাস জানা বাঞ্ছনীয় বলে মনে হয়। নাটক একটি চলমান ঘটনা প্রবাহ, আর এই প্রবাহের মূলভাবনা ভেবেছেন গোলাম মোস্তফা আর তার ভাবনার নাটকীয় লেখ্য রূপ দিয়েছেন কুমার প্রীতীশ বল। নাটকের নাম দিয়েছেন ‘কথা ৭১’। একাত্তরের সামগ্রিক কথা। ‘কথা ৭১’ নাটক দেখলেই একনজরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরু থেকে শেষাবধি জেনে নেওয়া যায় খুব সহজেই। ‘কথা ৭১’ নির্দেশনা দিয়েছেন দেবাশীষ ঘোষ। অভূতপূর্ব তার মঞ্চ ভাবনা। ২০০৫ সালে মঞ্চে আসা ‘কথা ৭১’-এর ৫৫তম প্রদর্শনী গত ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশে যেভাবে ঘুরে ফিরে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ ওঠে, তাতে সঠিক ইতিহাস কোনটা, তা নিয়ে অনেকেই বির্তকে জড়িয়ে পড়েন। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বা রাজনৈতিক দলের উচিত এমন নাটককে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। যেহেতু বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার বলেই নিজেদের দাবি করেন, সুতরাং এই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এই নাটক দেখানো অপরিহার্য বলে মনে হয়। যাহোক, এবার মঞ্চ ভাবনা বা নির্দেশনা প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার বা পরীক্ষণ হল নির্দেশকের ভাবনা অনুযায়ী সরিয়ে নড়িয়ে সাজানো যায়। তবে এক্ষেত্রে আমরা এরিনা আর প্রসেনিয়াম দুটো ফর্ম ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সেই ভাবনার সঙ্গে যে আরো কিছুটা যোগ-বিয়োগ করে নতুন ভাবনার জন্ম দেওয়া যায়, সেটা খুব কম নির্দেশকের নাটকে দেখা যায়। সেই কম সংখ্যক নির্দেশকের একজন দেবাশীষ ঘোষ। এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলের আদ্যোপান্ত ব্যবহার নিঃসন্দেহে সাধারণ দর্শকসহ সকলের নজর কাড়বে। নাটকের গল্প ও নির্মাণ ‘কথা ৭১’-কে এক অনন্য শৈল্পিক মাত্রায় প্রতিষ্ঠা করে। আর সেই শৈল্পিক মাত্রা নজর করতে যে সকল আনুষাঙ্গিকতার দরকার, তার অন্যতম আলো। ‘কথা ৭১’-এ সেই নান্দনিকতায় আলোর জাদুতে দর্শককে মোহাচ্ছন্ন করে রাখতে নির্দেশককে সহযোগিতা করেছেন আলোক নির্দেশক ঠান্ডু রায়হান। আলো-আঁধারির মায়ার খেলায় দর্শক ঘোরের মধ্যে ডুব দেয়। সাঁতরে বেড়ায় ১৯৭১ সালের বিভীষিকাময় নয় মাসে, আর একজন মুক্তিযোদ্ধা মুখোমুখি হন ইতিহাস না জানা আধুনিক মনস্ক সন্তানের।
সর্বোপরি, ‘কথা ৭১’ নাটকের মাধ্যমেই মুক্তিযোদ্ধারা বারবার ইতিহাসের সত্যের মুখোমুখি হন। মুক্তিযোদ্ধাদের এই সত্য ইতিহাস যথার্থভাবে উপস্থাপন হয়নি বলেই তরুণদের একটি অংশ আজও বিভ্রান্ত। ‘কথা ৭১’ ইতিহাসের সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করারই একটি উদ্যোগ মাত্র। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফিরোজ হোসাইন, কাজী চপল, সিফাত বিন আজিজ, শেখ শান-এ-মাওলা, এইচ এম মোতালেব, জোসেফ পরিমল রোজারিও, আবুল হাসনাত, কিরণ জাকারিয়া, খন্দকার আতিকুর রহমান, সম্রাট আহমেদ, শ্যামল হাসান, মিল্টন আহমেদ, তারেক আলী মিলন, শরিফুল ইসলাম মামুন, আখতার হোসেন, বিজন কান্তি ধর, বর্ণালী আক্তার সেতু, মারজিয়া জাবীন তন্বী, আবুবকর দাউদ তুহিন, মামুন উর রশিদ, মহফুজা আক্তার মিরা।
