প্রগতিশীলতার পথপরিক্রমায় ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৩৩

তারুণ্যের যে প্রবল সাহসী বঙ্গসন্তানেরা সেদিন পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অপশক্তির বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়েছিলেন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য, তাদেরই একজন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক। সেকালের পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গবাসী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করে, স্বৈরশাসকদের প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে জাতিগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে রক্ষার প্রবল প্রয়াসে জীবনদায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যারা ‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘সকল আঞ্চলিক ভাষার সমান মর্যাদা চাই’, ‘সকল রাজবন্দীর মুক্তি চাই’—স্লোগানে উচ্চকিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আহমদ রফিক ছিলেন এক সক্রিয় সংগঠক। সেই থেকে আদর্শিক জীবনধারায় প্রগতিশীল সক্রিয় রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই তো বাংলাভাষী মানুষের ঐতিহ্যগত লড়াইয়ের সফল কর্মী সংগঠকই নন কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতির সেবায় জীবন অতিবাহিত করেছেন বটে কিন্তু সমাজ পরিবর্তন নিয়ে ভেবেছেন নিরন্তর। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও তাদের মদদদাতা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী হানা-দখলের বিরুদ্ধে এই প্রায় নবতিপর বয়সেও হাতের কলমে শুভবুদ্ধির প্রচারে নিত্য রত। বয়সের ভারে নিঃসঙ্গ জীবনেও তার জীবনজয়ের অভিযাত্রা থামাতে পারেনি কেউ। আজ এই বয়সেও নিরন্তর লিখে চলেছেন সময়ের অন্যায়-অপকীর্তির বিরুদ্ধে, নিজ আদর্শিক চিন্তাধারার আলোকে। ড. আহমদ রফিক ন্যুব্জ হবার নন এই বয়সেও। অতিক্রম করে চলেছেন বার্ধক্যের সকল বাধা। উপেক্ষা করে চলেছেন দৃষ্টির আচ্ছন্নতা আর জীবন-নিঃসঙ্গতা।

ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম রূপকার, সক্রিয় সংগঠক আহমদ রফিক দেশের ভাষা-আন্দোলনকে সত্যনিষ্ঠ চিন্তা-চেতনায় তুলে ধরা এবং যথার্থ ইতিহাস বলে এবং লিখে বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রবলভাবে সোচ্চার। তবুও সময়ের স্বার্থান্ধ রাজনীতির সংকীর্ণ চিন্তাপ্রসূত উদ্ভট আবিষ্কারকে প্রতিহত করে চলেছেন তিনি।

ভাষা-আন্দোলনের মাস ১৯৫২, ফেব্রুয়ারি। দুরন্ত সাহসিকতায় ছাত্রসমাজের নির্ভীক সিদ্ধান্ত—মুসলিম লীগ সরকারের দেওয়া ১৪৪ ধারাকে ভঙ্গ করতে হবে, প্রত্যয়দৃপ্ত অঙ্গীকারে জানিয়ে দিলেন তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেনই। না হলে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন এইখানে খতম হয়ে যাবে। সুতরাং এখনি সময়, আঘাত হানবার। প্রগতিশীল ছাত্ররা সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন সেদিন আর সেখান থেকেই সূচনা হয়েছিল মুক্তিসংগ্রামের।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে প্রধান দুটি জায়গা যে ভূমিকা পালন করেছিল, তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, তা সত্যিই অবিস্মরণীয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মিছিলে গুলি চালিয়ে বেধড়ক ছাত্রহত্যা করেছিল মুসলিম লীগের নূরুল আমীন সরকার এই মেডিকেল কলেজের সামনেই। এখানে মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন আহমদ তো ছিলেনই, তার সাথে ছিলেন গোলাম মওলা, বদরুল আলম, সাঈদ হায়দার আর আহমদ রফিক। এ ক’জন তরুণ আন্দোলনে তো সক্রিয় ছিলেনই, তার ওপর তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন শহীদ যারা হয়েছেন একুশে’তে তাদের স্মরণে একটি স্মৃতির মিনার গড়ে তুলবেন। শামসুদ্দিন আহমদ মিনারের চিন্তাটা ব্যক্ত করলেন আর বদরুল আলম নকশা করে ফেললেন এবং সাঈদ হায়দার, আহমদ রফিক, গোলাম মওলা, আলী আসগরসহ ওরা সবাই আনাড়ি হাতে
ওস্তাগরের কাজ করে একটি ‘শহীদ মিনার’ গড়ে তুললেন। ইট, বালি, সুরকি, সিমেন্ট জোগাড় হলো, আর ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ প্রাণে গড়ে তুললেন স্মৃতির মিনার কোনো রাজমিস্ত্রির সহযোগিতা না নিয়েই। সেদিনের প্রতীকী প্রতিবাদী মিনার কালক্রমে আজ জাতির সংকটে, সমস্যায়, আনন্দ-উল্লাস প্রকাশের জায়গা হয়ে গেছে। শহীদদের কাছে গিয়ে যে কোনো সংগ্রামী আন্দোলনকারী মন্ত্র উচ্চারণ করে শপথ নেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার। আহমদ রফিকদের টগবগে খুন সেদিন কমরেডদের হারিয়ে সংঘবদ্ধতার অভূতপূর্ব স্বাক্ষর রেখেছিল ভাষা-আন্দোলনে, সরকারি নিপীড়ন উপেক্ষা করে। কোনো ব্যক্তির কৃতিত্বে তো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সফলতা পায়নি, পেয়েছিল এই যূথবদ্ধ ছাত্রশক্তিতে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক ছিল তখন গোপন বৈঠকের স্থান আর আহমদ রফিকদের কক্ষগুলোই এ উদ্দেশ্যে ব্যবহূত হতো। এখানে বলে রাখি, এই মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণেই ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজা এবং পরে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর সেদিনই সর্বদলীয় কমিটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছিল অলি আহাদকে আহ্বায়ক করে। পরে এখানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় একমাত্র বক্তা ছিলেন যুবনেতা মোহাম্মদ ইমাদুল্লাহ। জ্বালাময়ী ভাষণে সেদিন ঢাকাবাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন ছাত্রহত্যা হয়েছে, মিলিটারিরা লাশ গুম করে ফেলেছে। আহমদ রফিক, সাঈদ হায়দার, শামসুদ্দিনরা যেমন আহতদের সেবা-শুশ্রূষা করেছেন, তেমনি শহীদদের লাশ পাহারা দিয়ে রেখেছেন যাতে পুলিশ-মিলিটারি গুম করতে না পারে। আর ২৩ ফেব্রুয়ারি আহমদ রফিকরাই সারারাত ধরে কাজ করে শহীদ মিনার গড়ে তুলেছিলেন। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের স্মৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা শহীদ মিনারটিকে তিনদিন পর মিলিটারিরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সব ইট পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল।

ভাষা-সংগ্রামের ইতিহাস যখন বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে একটি চিহ্নিত মহল, তখন এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন আহমদ রফিক তার লেখার মাধ্যমে। তাই তিনি ভাষা-সংগ্রামের লড়াকু নায়ক ভাষা মতিনের সাথে এবং এককভাবে নিজেও গ্রন্থ রচনা করে অপপ্রচারের প্রতিবাদ করেছেন, আজও করছেন। নিরন্তর প্রতিবাদ করছেন কারণ আমলে আমলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে মিথ্যাচারে কলঙ্কিত করে একের পর এক নতুন বই রচিত হচ্ছে। প্রত্যয়দৃপ্ত সংগ্রামের লড়াকু সৈনিকদের কথাকে কনট্রাডিক্ট করেই তারা লিখছেন বড় বড় কেতাব। জীবদ্দশায় ভাষাসংগ্রামীদের সামনে যখন অমন উদ্ভট ঘটনাবলির অবতারণা হয় তখন তো আহমদ রফিকদের মতন সৈনিক-সংগ্রামীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না সেই স্বকপোলকল্পিত কাহিনি।

আহমদ রফিক চিকিত্সাবিদ্যায় অধ্যয়ন করে কৃতিত্বের সাথেই বেরিয়ে ছিলেন মেডিকেল কলেজ থেকে, কিন্তু পেশায় মনোযোগ দিতে পারেননি পাকিস্তানি দুঃশাসনবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে। পেশায় কতদিন নিয়োজিত ছিলেন বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি, যতদিন তার চেম্বার ছিল, ততদিন বেশির ভাগ প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আশ্রয়স্থল ছিল সেটি। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যার উত্থান, যিনি প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শধারায়। আদর্শিক চেতনায় কিছু করতে না পারার আত্মোপলব্ধি ও ক্ষোভ ছিল সবসময়, এখনো আছে। ক্ষোভে-বিক্ষোভে নীরবে বিস্ফোরিত হয়েছেন, আদর্শধারকদের প্রতিও কিছু করতে না পারার ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে কোনোদিন হতাশ হননি। মানুষটি যে দীক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক চিন্তাশ্রয়ী হয়েছিলেন সেখানে কিন্তু তিনি অনন্য। তার কাজের মাধ্যম হিসেবে যে ধারা বা মাধ্যমই গ্রহণ করুন না কেন, তিনি কিন্তু কোনোদিন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মন-মানসিকতা থেকে সরে যাননি, আপস করেননি কোনো অন্যায়ের সাথে। তাই তিনি যে কোনো অন্যায়, যেই করুন না কেন, তারই বিরুদ্ধে কড়া কথায় সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। পুঁজিবাদের অনুসারী ভোগবিলাসী সমাজ ও রাজনৈতিক শাসনকে তিনি সবসময় অগ্রাহ্য করেছেন এবং গণমানুষের পাশেই থেকে কখনো সরাসরি কখনো পরোক্ষে তার মেধা ও শ্রম বিলিয়েছেন। রাজনৈতিক চেতনায় রফিক ভাই আজও আমাদের অনুপ্রেরণা। তাই তো তিনি নিয়মিতভাবে সংবাদপত্রে কলাম লিখে যাচ্ছেন।

ভাষার প্রতি যার অপরিসীম আনুগত্য, লড়াই করে যে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে প্রাণ উত্সর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন, সেই আহমদ রফিক তার মেধা এবং শ্রম খাটিয়ে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র গড়ে তুললেন ১৯৭৯ সালে। এখানে উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসনকালে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রশতবর্ষ পালনে সামরিক জান্তা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল। তা সত্ত্বেও বাংলার সচেতন নাগরিকবৃন্দ গড়ে তুলেছিলেন একাধিক সংগঠন কবিগুরুর জন্মশতবর্ষ পালন করার জন্য। সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা সবাই সফল হয়েছিলেন রবীন্দ্রশতবর্ষ পালনে। বৈরী শাসকগোষ্ঠী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কোনোভাবেই আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির রূপকার হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি ছিল না। আদতে বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি, বিশেষ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তারা গ্রহণ করতে পারেনি। আর সেকারণেই বঙ্গসংস্কৃতিকেও নানা নিষেধাজ্ঞায় ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। তারই পরিণতিতে ৫ বছর পরে আকস্মিকভাবে পাকিস্তান পার্লামেন্টে তত্কালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষণ দিয়ে বললেন, ‘‘Tagore is not a part and parcel of our art and literature’’। খবরের কাগজে এটি প্রকাশের সাথে সাথে পূর্ববঙ্গে কঠিন প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয়। সারাদেশ সেদিন গর্জে উঠেছিল এবং প্রতিবাদে ক্রান্তি, ছায়ানট, বুলবুল একাডেমী, সৃজনী, সংস্কৃতি সংসদ এবং ঐক্যতান-এর সম্মিলিত প্রয়াসে ওই ঔদ্ধত্যের জবাব দেওয়ার জন্যে গঠিত হলো ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ’। গর্জমান পূর্ববাংলা ক্রমশ আপন অধিকার আদায়ের পথে এগিয়ে ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছাল। সেবছরই ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ী হলাম, দেশ হলো শত্রুমুক্ত। এদিকে ভাষা-সংগ্রামী আহমদ রফিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে অবমূল্যায়ন করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত গ্রহণ করলেন। আর বিজয়ের ৮ বছরের মধ্যেই ১৯৭৯ সালে তিনি গড়ে তুললেন রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র। তার এই কাজের সঙ্গে কিছু প্রাজ্ঞ ও তরুণ বুদ্ধিজীবী যুক্ত হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলের শেষ দিকটায় কবিগুরুকে বিসর্জনের যে ন্যাক্কারজনক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তার বিরুদ্ধে কেবল রবীন্দ্রপ্রেমী বুদ্ধিজীবীই নন, সচেতন নাগরিক পর্যন্ত পাকিস্তানি এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে একথাও ঠিক তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যাদের আমরা প্রতিক্রিয়াশীল বলি এবং মনে করি, তারা সরকারের ওই রবীন্দ্রবিসর্জন নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতিও দিয়েছিল। আগেই বলেছি, রবীন্দ্র বিসর্জনের বিরুদ্ধে তত্কালীন পূর্ববঙ্গ প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল। আর তারপর দেশে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ায় এবং রবীন্দ্রপ্রেমীরাও দেশমাতৃকার সেই সংগ্রামে নিজেদের নিবেদন করায়, বিজয় অর্জনের পর পূূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে শুধু রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সাহিত্যিক চিকিত্সক আহমদ রফিক এই আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তাই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রবীন্দ্র সাহিত্যচর্চার এই সংগঠনটি আহমদ রফিকের নেতৃত্বে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কলকাতার ঐতিহাসিক ‘টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সাথে সখ্য গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটির। আহমদ রফিকের এই রবীন্দ্রচর্চার অভিযাত্রা কেবল গৃহকোণের বৈঠক ও সেমিনার সিম্পোজিয়ামেই সীমাবদ্ধ থাকল না, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে রবীন্দ্রসম্মেলনও আয়োজন করতে শুরু করল। প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পর ১৯৯৪ সালে ঢাকায় প্রথম সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়। এরপর রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র আরো দুটি সম্মেলন আয়োজন করেছিল ঢাকায় ১৯৯৬ এবং ১৯৯৮ সালে। রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রণে কলকাতায়ও গিয়েছিল আর ঢাকায় অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র সম্মেলনে পশ্চিম বাংলার প্রথিতযশা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো এজাতীয় মহত্ কাজে কোনো ‘মহত্প্রাণ’ মানুষকে অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। রবীন্দ্র রচনাবলি কিনে শেলফ কিংবা আলমারি সাজিয়ে রাখার আত্মতৃপ্তি কিন্তু অনেকেই অনুভব করেন, জানি না পড়ে দেখেন কি না। ফলে আহমদ রফিকের এই সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রটি তৃতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন আয়োজনের পরপরই বন্ধ হয়ে যায়।

নবতিপর বয়সে বার্ধক্যের ছাপ তো পড়বেই, তাই অর্থকষ্টে কেন্দ্রটি বন্ধ করলেও তিনি সক্রিয় রইলেন নিজস্ব আবেগ এবং আদর্শের জায়গায় অর্থাত্ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে ‘একুশে চেতনা পরিষদ’ নামে যে সংগঠনটি ভাষাসৈনিকেরা মিলে গঠন করেছিলেন গাজীউল হকের নেতৃত্বে, তার মৃত্যুর পর সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক সংগঠনটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আজও তিনি এই সংগঠনের সভাপতি। তার নেতৃত্বে ফিবছর না হলেও মাঝে-মধ্যেই ভাষাসৈনিক সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে ঢাকায়। গত দু-তিন বছর হলো একুশে চেতনা পরিষদের সেই সমাবেশ আর ডাকা সম্ভব হচ্ছে না কারণ ভাষাসৈনিক—যাদের আমরা এখন ভাষা-সংগ্রামী হিসেবে সম্বোধন করছি, তাদের প্রায় সবাই বয়সে আশি থেকে নব্বইয়ের ঘরে। সেকারণেই ভাষা-আন্দোলনের নৈতিক উত্তরাধিকারটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি ভাষাসৈনিক না বলে ‘ভাষা-সংগ্রামী’ শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। অর্থাত্ কিনা যারাই ভাষার লড়াইয়ের নৈতিকতার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন, তারা যেন এই আন্দোলনকে অব্যাহত রাখতে পারেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, ভাষা-আন্দোলন নিয়ে আমরা অনেকেই গলা উঁচিয়ে কথা বলি, কথিত গবেষণার মাধ্যমে বৃহদাকারের গ্রন্থ রচনা করি এবং বছর বছর একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরি শুধু না করে মধ্যরাতে ভাষা-শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাও নিবেদন করি। কিন্তু এই আন্দোলন বা সংগঠনটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ দেখি না অথচ ভাষা-আন্দোলন নিয়ে ব্যবসা করতে কোনো লজ্জা নেই। শ্রদ্ধেয় আহমদ রফিকদের তৈরি প্রথম শহীদ মিনারের একটি প্রতীকী স্মৃতির মিনার ২০১০ সালে আজিমপুরের কয়েকজন সেইসময়ের তরুণের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমীতে স্থাপিত হয়েছিল, নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের পুরনো ইতিহাস তুলে ধরার জন্য। ইতিপূর্বে কয়েকটি ভাষা-সংগ্রামী সমাবেশ এই শিল্পকলা একাডেমীতেই আয়োজন করা হয়েছিল, অবশ্যই আহমদ রফিকের নেতৃত্বে।

নবতিপর ভাষা-সংগ্রামী আহমদ রফিক এখনো নিয়মিতভাবে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কলাম লিখে যাচ্ছেন। তার চোখের অবস্থা খুব ভালো নেই। সন্ধ্যের পর তার পক্ষে লেখা সম্ভব হয় না। নিউ ইস্কাটনের ‘আহমদ রফিক সড়ক’-এর একটি বাড়িতে তিনি বাস করেন। ফ্ল্যাটটিতে তিনি একাই থাকেন। ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে যারা সাহসের সঙ্গে নিজেদের উত্সর্গ করেছিলেন, আজ তাদের বয়স যখন অশীতিপর থেকে নবতিপর পর্যায়ে তখন কি রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব নেই এইসব মহান পুরুষদের দৈনন্দিন জীবন সুষ্ঠুভাবে কাটানোর পদক্ষেপ গ্রহণের?

ভাষা-সংগ্রামী আহমদ রফিক আপনাকে সশ্রদ্ধ সালাম। আপনি দীর্ঘজীবী হোন, সুস্থভাবে জীবন কাটান।

আহমদ রফিক, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯