আমি তোমাকেই বলে দেব

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৩৫

আরেকটু পর একটা বিষণ্ন বিকেল। চোখের পাতা ভারী হয়ে ঘুম নামি নামি করেও নামে না। ভার মাথা নিয়ে একলা বারান্দায় একটা অসুস্থ শহরের দিকে চেয়ে থাকি। যেখানে, আবর্জনার ভাগাড়, কালো ধোঁয়া, পিঁপড়ের মতো মানুষ হাঁচরে পাঁচরে গুঁতোগুঁতি করে চলছে। এখানে ফুলের সুবাস অকল্পনীয়, দুর্গন্ধ অসহনীয় হলেও চেনা। এখানে ঝগড়াঝাটির খিস্তিখেউর কানে আসে, কোনো সংগীতের নয়। জীবনযাপনের মূল্য চড়া, মরণ বরং অপেক্ষাকৃত সস্তা। তাই, সস্তা কিছু ধোঁয়ায় ফুসফুসে নিকোটিন নিতে নিতে ধূম্রশলাকার প্যাকেটের গায়ে সংবিধিবদ্ধ সতর্কতার গা ঘিন ঘিনে ছবিটা দেখে কোনো উচ্চমার্গের বোধোদয় ঘটে না। এই করে করে বিরক্তির ভাঁজ কপালে আর ঠোঁটের পাশে জমিয়ে সন্ধ্যে নামে।

বছর দুয়েক আগে যখন রিনির সঙ্গে ভাব ছিল তখন ছুটির দিনগুলোতে রান্নাঘরে খিচুরি আর গরম ঘিয়ের সুবাস, রিনির গায়ের রেগুলার পারফিউমের সুবাস, বিছানায় হুটোপুটি, অন্তিম সুখের পর ওর গাঢ় হয়ে আসা নিঃশ্বাসে ওঠানামা করা অনাবৃত বুক, ব্রা’র হুক লাগিয়ে দেওয়া, ওর কাপড় পরা, ওকে এগিয়ে দেওয়া এসবে বেশ সময় কাটত। রিনির জামাইয়ের পোস্টিং হঠাত্ করে অন্য শহরে হয়ে যাওয়ায় রিনির সাথে এখন আর দেখা হয় না। যোগাযোগও হয় না। কয়দিন আগে ফেসবুকে দেখলাম কেমন ফোলা ফোলা শরীর। বাচ্চা টাচ্চা হবে হয়তো!

মাঝে মাঝে অচেনা কোনো রাস্তায় একা হাঁটি। সেখানেও বিপদ। আউল ফাউল পোলাপান উল্টাপাল্টা কথা জিগায়। মুরুব্বি টাইপ লোকজন চশমার ওপর দিয়ে রক্তচক্ষু চাউনি দেয়। বিরক্ত লাগে। মুখে ঘসঘসে দাড়ি হয়েছে। কাটা হয় না অনেকদিন। কাপড়চোপরে ধোপদুরস্ত ছিলাম না কোনোকালে। তাই কি সন্দেহজনক মনে হয়?

মিনতি বলে এক বেশ্যার কাছে গিয়েছিলাম এক বৃষ্টির রাতে। রাস্তায় আনমনে হাঁটছিলাম। কোথায় যাচ্ছিলাম মনে নেই। ল্যাম্পপোস্টের নিচে সস্তা মেকাপ, উদ্ভট গোলাপি লিপস্টিক দেওয়া এক মেয়ে ডাকল। মেয়েরা ডাকলে আমি আবার না করতে পারি না। কাছে যেতেই বলল, ষাট টাকা দিলেই হবে। আমি কথা না বাড়িয়ে তার পেছন পেছন গেলাম। ও ওর ছাপরা ঘরে ঢুকে বুকের আঁচল সরিয়ে কাছে এল। এসেই আমার দুই পায়ের ফাঁকে হাত বোলাতে লাগল। বুঝলাম, ওর বড্ড তাড়া। আমি বললাম, ‘কী নাম রে তোর?’

বলল, ‘মিনতি’

আমি বললাম, ‘মিনতি, তোমার নাম তো এটা সত্যি না, সত্যি নাম জানতেও চাই না। শুধু একটা কথা বলো, ‘আমার চেহারা কি তোমার পছন্দ হয়?’

মিনতি বলে, ‘হ্যা হয়।’

 ‘সত্য বলো। টাকা এমনেই পাবা।’

মিনতি এবার ভালো করে মুখের দিকে তাকায়, বলে, ‘আপনার চেহারা আসলে হিরোইঞ্চিগো মতন লাগতাছে। খান নাই কয়দিন?’

আমি খেয়েছিলাম। কিন্তু খেয়ে বমিও করেছি। আমি বললাম, ‘তুমি আমার জন্য একটু খাবার এনে দাও। তারপর সব করি।’

মিনতি তার নারীসুলভ মমতায় বাইরে গেল বাটারবন আনতে। আমি তার ঘরে একশ টাকার একটা নোট রেখে বেরিয়ে পড়লাম। নিজস্ব তাড়না আর অন্যপক্ষের আগ্রহ ছাড়া যৌনতা আমার রোচে না।

অল্পবয়সে দুনিয়া একটা বিস্ময়ের ঝাঁপি উপুড় করে ধরে। তখন সবকিছুতেই কী ভয়ানক উত্তেজনা, আগ্রহ আর ভালোলাগা কিলবিল করে ধমনিতে। কিছু বোঝার চেয়ে, ধারণের চেয়ে উত্তেজনা, ভয়, আবেগ, ভালোলাগা, মন্দলাগা সবই বেশি। পনেরো বছর বয়সে একলা বাড়িতে যখন ঝুনু কাকী প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে দিল, তখন মনে হচ্ছিল ভয় আর আনন্দে মরেই যাব। দুই বছর কাকী মজা নিয়েছে খুব। আমারও নেশা হয়নি তা বলি কী করে। কিন্তু ঐ যে, আগ্রহ ফুরিয়ে যায়। কখনো আমার কখনো অন্য পক্ষের। কোলে ছেলে আসতেই ঝুনু কাকী ভদ্র হয়ে ছোঁয়া বাঁচিয়ে বরের পেছন পেছন চলতে লাগলেন। তারপর আমিও আড়ালে আবডালে কেঁদেকেটে নিজেকে সামলে অন্য পথ ধরলাম।

অন্য পথ ধরা বলতে, ঘরপালানো অভ্যাস হয়ে গেল। হুটহাট ট্রেনে বাসে করে দূর-দূরান্তে চলে যেতাম। বাবা মানুষটা জীবিত থাকলেও আমার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন বরাবর। একবার বাসে করে কুষ্টিয়া লালনের আখড়ায় এক সপ্তাহ কাটিয়ে যেদিন রাতে ঘরে ফিরলাম, দেখি বাবা আর বাসার কাজের মানুষ খোদেজা বিনা কাপড়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। আমায় দেখে খোদেজা খালা লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে কাপড় জড়াতে জড়াতে পালিয়ে গেল, কিন্তু বাবা আমায় দেখে তেমন লজ্জিত হলেন না। লুঙ্গি কোমরে গিঁঠ দিতে দিতে হাই তুলে বললেন, ‘কখন আসলি?’

আমি কাউকে বলিনি। এমনিতেও বলতাম না। খোদেজা খালা হাতে পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে কী কী সব বলছিল। এখন আর সেসব মনে নেই। তবে সে অসহায় ছিল। স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা আর আমার বাবার বয়সও এমন নয়। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার বাবার মতো তার প্রতিও আমার আগ্রহ নেই।

যে মানুষটাকে সবচেয়ে ভালোবাসতাম। অভিভাবক বা বন্ধু হিসেবে, সে ছিল ছোটকাকা। এই মানুষটা আমায় আগলে রাখত, শাসন করত। কত রাত আমরা যাত্রা দেখতে যেতাম, মাছ ধরতে যেতাম। খুব বেশি বয়সের পার্থক্য ছিল না, বছর ছয়েকের বড় হবে সে। এক ছুটির বিকেলে আমায় বলল, ‘বুলু, কাল ঢাকা যাব রে! একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে। হলে তোকে ঢাকায় নিয়ে ভালো কলেজে ভর্তি করে দেবো!’ আমি ভবিষ্যতের আনন্দে ছোটকাকাকে বাসে তুলে দেই। বিকেলে খবর আসে, বাস এক্সিডেন্টে ছোটকাকা মরে গেছে।

ছোট কাকাকে দাফন করার দুই দিন পর বাসায় বিরাট উত্সব! এর নাম কুলখানি। কত জায়গা থেকে যে লোকজন এল! সবাই নাকের পানি চোখের পানি দেখাতে চায়। যাদের আসে না তারা নাকে মুখে আঁচল দিয়ে থাকে। তারপর খেয়ে দেয়ে বাড়তি দুই প্যাকেট নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফেরে। এদের খাওয়ালে ছোট কাকা পরপারে খুশি থাকবে মন মানতে চায় না। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে দূরে কাশফুলে ঢাকা মাঠে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। আমার কান্না পায় না মোটেও।

 বয়স যখন একুশ, সিরিয়াস প্রেম হলো। মানে ‘ওকে ছাড়া বাঁচব না’ টাইপ আরকি। মুন্নি আমাদের সাথেই কলেজে পড়ত। সেও কখনো হাত কাটত, কখনো আমি ঘুমের ওষুধ গিলতাম, এরকম ভয়াবহ অবস্থা। কারণ দুই পরিবার রাজি না। আমি ওকে নিয়ে পালাতে চাইতাম। কিন্তু সে রাজি না। আলটিমেটলি নানা কাহিনি করে সে বিসিএস ক্যাডারের এক আঙ্কেলকে বিয়ে করে চলে গেল। আমি মানসিকভাবে ছয় মাস এলোমেলো থেকে আবার ট্র্যাকে ফিরে এলাম, কিন্তু, মেয়েমানুষের প্রতি শ্রদ্ধাটা চলে গেল। মা নিয়ে দয়া করে সেন্টিমেন্টাল ডায়লগ মাইরেন না। মা জ্ঞান হওয়ার আগেই মারা গেছেন। তাই মা কী সেই বিষয়ে অজ্ঞ।

আচ্ছা, বাদ দেন! এখনকার কথায় আসি। কয়দিন যাবত্ বাসা খুঁজতেছি। বাড়িওয়ালা নোটিস দিছে। এমনি বলছে, ফ্যামিলির প্রয়োজনে, কিন্তু তার চেহারায় আমি ভয় দেখছি। আমার চেহারা হয়তো আরো সন্দেহজনক হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রুবসাত নামের এক ফ্রেন্ড তার পরিচিত কিছু মেয়েমানুষ নিয়ে এসে আমার কাছে বাসার চাবি চায়। আগে লজ্জা পেত, এখন স্বাভাবিকভাবেই চায়। শেষবার আমি কেন যেন আর দেই নাই। আরেকজনের রঙ্গরসে ভরা বিছানায় দিন শেষে ঘুমাতে ইচ্ছা করে না বলেই হয়তো! যা-ই হোক,  সেই রাগে বাড়িওয়ালাকে সে কিছু বলে থাকতে পারে। আমি এতে কিছু মনে করিনি। তবে বাসা পাচ্ছি না সেই চিন্তায় আছি। আপনার চেনাজানা কোনো বাসা থাকলে বলতে পারেন। ব্যবসায় লালবাতি জ্বলা একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করে যে অনিয়মিত বেতন পাই তাতে মাসে তিন মাসে বাসা ভাড়াটা চালিয়ে নিতে পারব, বিশ্বাস করুন!

চার কন্যার পিতা আমার বর্তমান বাড়িওয়ালা যখন আমার ব্যাচেলর হওয়া আর জার্নালিস্টের একটা ভুয়া আইডি কার্ড দেখে চকচকে চোখে তাকিয়ে ছিলেন তখন তাকেও এই কথা বলে তার মনের বেলুন চুপসে দিয়েছিলাম। কী করব বলুন! আমার চেহারা খারাপ হলেও সাদা তেলাপোকার মতো তার কোনো মেয়ের পাশে রাত কাটাব এই ভাবনা বড় ভীতিকর লাগছিল। তারপরও মাঝে মাঝে বাড়িওয়ালী ঘরে খাবার দিয়ে পাঠাত। মেয়েগুলো অনিচ্ছায় আসত। বড় মায়া লাগত তখন। আমি যখন ক্ষুধা পেটেই বলতাম, খেয়ে এসেছি, তখন হাঁফ ছেড়ে চলে যেত। আমি একা শুয়ে হাসতাম।

বাড়ি থেকে একবার বিয়ে দেওয়ার খুব তোড়জোড় শুরু করলেন আমার এক ভাবী। তার কোনো বান্ধবীর ছোট বোন অনার্সে পড়ে, ফর্সা টকটকে, লম্বা চুল হেনতেন। তো তখন রিনির সাথে আমার নিয়মিত খেলা চলে, হাঃ হাঃ হাঃ। আমি তাও বাড়ি গেলাম মেয়ে দেখতে। মেয়ে তেমন কথা বলল না, কিন্তু, ওরা ‘হ্যাঁ’ বলে দিল। আমিও ভাবলাম, পরের বউ নিয়ে আর কত, এবার নিজের একটা সংস্থান হলে মন্দ কি! মেয়েটার নাম ছিল... থাক নাম না বলি! তো মেয়ে তো দেখে এলাম। এর কিছুদিন পর কোনো সাড়াশব্দ পাই না। তখন, আমার তো রিনি ছিল, চাওয়া পাওয়া ছিল না। তাই আর খোঁজ নেওয়া হয়নি। বেশ কিছুদিন পর হঠাত্ এক নিউজে দেখি সেই মেয়ের ছবি। নিউজের শিরোনাম ‘সন্তানের পিতৃত্বের পরিচয়ের ও বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকা।’ সেখানে নাম আর ঠিকানা দেখে বুঝতে পারলাম এই সেই মহানায়িকা যিনি আমার জীবনে আসবেন বলে ভেবেছিলাম। নিউজ পড়ে এত হাসছিলাম যে আমার কলিগ রোকন ভাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। পৃথিবী বড়োই বিচিত্র! 

প্রয়োজন আমাদের আবেগ, ভালোলাগা তৈরি করে। যারা আসে তারা প্রয়োজনে আসে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে নোঙ্গর তুলে অন্য বন্দরে তরি ভেড়ায়। আমিও তার ব্যাতিক্রম নই। কিন্তু মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ভালোবাসার জন্য খুব বিরক্ত করে। তখন রিনি, ঝিনি, মিনি, যারা আমার বুকের দিঘিটায় চুমুক দিয়ে জল খেয়ে গেছে, কিন্তু ঘর বানায়নি তাদের জন্য বড্ড মন কেমন করে। ফেসবুকে ওদের প্রোফাইল দেখি। ওদের হাসিমুখের ছবিতে সুখ ঝরে পড়ে। আমি দেখি আর দেখি। রাত বাড়ে, চোখের কোলে কালশিটে গাঢ় হয়। রাস্তায় পাহারাদারের হুইসেল বাজে। আমি চোখ বন্ধ করে খুব প্রিয় একটা মুখ ভাবতে চেষ্টা করি। তাকে ভুলে গেছি, কিন্তু সে আমার গহিনে অতল জলে সাঁতরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে পেটের পুরনো ব্যথায় কোরবানির জবাই হওয়া পশুর মতো গোঙাই। তখন ঐ মহিলাকে আরো বেশি ভাবি আমি। তাকে ভাবলে ব্যথা কমে যায় আমার। আমি জানি, পেটের যে কর্কট আমায় কুরে খাচ্ছে তার কল্যাণে খুব শীঘ্রই তার সাথে দেখা হবে আমার। একটু ভালোবাসা কি মিলবে না অমোঘ নাড়ির টানে?