একটি পণ্য বা সেবা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ পার করিয়া ভোক্তার হস্তে গিয়া পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিতে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বা সরবরাহ চক্র ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হইয়া থাকে। আধুনিক যুগের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উত্পাদন ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কার্যক্রম ও প্রযুক্তি যুক্ত হইয়া থাকে। এই সত্য যেকোনো উত্পাদনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থনীতির ভাষায় ইহাকেই সাপ্লাই চেইন বলা হইয়া থাকে। অর্থাত্ বর্তমান বাস্তবতায় আমরা দেখিতে পাই, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উত্পাদন সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌঁছাইবার কোনোই সুযোগ নাই। ইহা কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশে শিল্প উত্পাদন শুরু হইবার পূর্বে কৃষিই ছিল একমাত্র বাণিজ্যিক কার্যক্রম। বিশেষ করিয়া ধান, পাট, গম ও নানা উত্পাদিত দ্রব্য কৃষকের নিকট হইতে বাজারে আসিত। এই ক্ষেত্রে স্বল্প পরিমাণ বা স্বল্পসংখ্যক উত্পাদিত পণ্য কৃষক নিজেই ভোক্তার হাতে পৌঁছাইয়া দিতে পারেন। কিন্তু যখন তাহা পরিমাণে বেশি হয় তখন মধ্যস্বত্বভোগী অপরিহার্য হইয়া পড়ে। এখনো তাহাই আছে। আবার এই মধ্যস্বত্বভোগী যে সর্বদা অনাকাঙ্ক্ষিত তাহাও নহে। অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগী সেবামূলক ভূমিকাও পালন করিয়া থাকে। যেমন একজন কৃষক ধান উত্পাদন করিয়া তাহা ভোক্তার নিকট পৌঁছাইতে পারেন না। তাহাকে ধান মাড়াই করিয়া চাল তৈরি করিতে হয়। যদি পরিমাণে এতটা হয় যে একজন ভোক্তার ক্রয়যোগ্য নহে, অর্থাত্ পণ্যের জন্য ভোক্তাগোষ্ঠী প্রয়োজন, সেই ক্ষেত্রে আড়তদার, ফড়িয়া অথবা পাইকার প্রয়োজন হইয়া থাকে।
দেশে আমরা লক্ষ করিয়াছি, সরকার কৃষকের নিকট হইতে সরাসরি চাল ক্রয় করিবার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। সেই উপলক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য নীতিমালা ২০১৭ গৃহীত হইয়াছে। এই নীতিমালায় বলা হইয়াছে, কৃষকদের নিকট হইতে সরাসরি মৌসুমে উত্পাদিত ধান গম এবং বৈধ ও সচল চালকল মালিকদের নিকট হইতে মৌসুমে ছাঁটাই করা ধান হইতে চাল সংগ্রহ করা হইবে। ইহার উদ্দেশ্য হইল কৃষক যাহাতে উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। কিন্তু নানা জটিলতায় কৃষকের নিকট হইতে সরাসরি উত্পাদিত পণ্য ক্রয় সম্ভব হইয়া উঠে না। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রে এমন ব্যবস্থা নাই, যাহাতে লক্ষ লক্ষ মেট্রিক টন পণ্য কৃষকের নিকট হইতে সরাসরি ক্রয় করা যাইতে পারে। বলা হইয়াছে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত কৃষক শনাক্তকরণের কথা। কিন্তু ব্যাপক এই আয়োজনে কোন কৃষক কতটা উত্পাদন করিতে পারিবে, কতটা সরকারের হাতে তুলিয়া দিতে পারিবে, তাহার সুব্যবস্থার উপায় কী? দ্বিতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগীরাও তাহাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাইয়া থাকেন। ইহাকে একটি পেশা হিসাবে লইয়াছে। বিভিন্ন পণ্যবাজারে সংখ্যায় তাহারাও লক্ষ লক্ষ। সুতরাং বিকল্প হিসাবে আমরা মনে করি, একটি ব্যবস্থা দাঁড় করাইতে হইবে যাহাতে সকলেই নিজ নিজ পেশায় স্থির থাকিতে পারে। সেই সঙ্গে চেষ্টা করিতে হইবে কৃষকের উত্পাদন ব্যয় কমাইয়া আনিতে। তাহা হইলেই উত্পাদক হইতে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ চেইন মসৃণ থাকিবে।
