সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষ দেশে দেশে ভ্রমণ করে আসছে। পৃথিবী দেখার দুর্নিবার নেশায় মানুষ সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়েছে—বিক্ষুব্ধ মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছে অজানা অচিন দেশে। এইভাবেই অনেক অচেনা প্রান্তর আবিষ্কার করে মানুষ, গড়ে তোলে মানব বসতি, যা পরবর্তীকালে রূপ নেয় মানবসভ্যতায়। মানুষের এই দুর্নিবার ভ্রমণ-আকাঙ্ক্ষা থেকেই পর্যটনশিল্পের উত্পত্তি। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পের রূপ ও প্রকৃতিতে এসেছে অভাবিত পরিবর্তন। পর্যটন এখন শুধু কোনো ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দেশভ্রমণ নয় বরং সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্য একটি সর্বজনীন আর্থসামাজিক উন্নয়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে পর্যটন পরিণত হয়েছে একটি শিল্পে, যা অনেক দেশের অর্থনীতির মুখ্য উপাদান, সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম হাতিয়ার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বৃহত্ ক্ষেত্র হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ শিল্প বিশ্বব্যাপী একটি দ্রুত বিকাশমান খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে। এদেশের সৌন্দর্যে তাই যুগে যুগে ভ্রমণপিপাসুরা মুগ্ধ হয়েছেন। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের হলেও বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণে যে বৈচিত্র্য তা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এদেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকনের স্থান সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রঙের নয়নাভিরাম চারণভূমি সিলেট, আদিবাসীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি ও কৃষ্টি আচার-অনুষ্ঠানসমৃদ্ধ উচ্চ সবুজ বনভূমি ঘেরা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। পর্যটনশিল্পের সবটুকু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মডেল হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন সূচকে সাফল্য অর্জন করেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ২০১৯ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। তাতে দেখা যায় বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের পর ভারতের অবস্থান। পর্যটনশিল্পের ব্যাপকতার অন্যতম এর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিহিত রয়েছে। সেই দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো গতিশীল করতে ও ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরিতে এই শিল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমানে পৃথিবীর ১০টি কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কর্মসংস্থান তৈরি হয় পর্যটন খাতে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি খাতে পর্যটনশিল্পের মোট অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। আর এই খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মোট ২৪ লাখ ৩২ হাজারটি।
২০১৮ সালে পর্যটন খাত সারা পৃথিবীতে প্রায় ৩১৯ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যা সারা পৃথিবীর মোট কর্মসংস্থানের ১০ ভাগ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিক থেকে এই খাতের অবস্থান বিশ্বে প্রথম পাঁচটি শিল্পের মধ্যে একটি। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে পর্যটন খাত আরো প্রায় ১০০ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বিশ্বে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এশিয়া অঞ্চল শীর্ষে রয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে।
প্রতি বছরের মতো এই বছরও বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করা হবে। এই বছর পর্যটন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘সুন্দর আগামীর জন্য পর্যটনে কর্মসংস্থানের ভূমিকা’। এটি সারা পৃথিবী তথা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১২.৮ শতাংশ। আর উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে আসছে যার একটি বড়ো অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। যেহেতু পর্যটন একটি শ্রমঘন শিল্প, তাই বেকারত্বের নিরসনে পর্যটনশিল্প ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান সরকার বিগত ১০ বছরে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য পর্যটন অঞ্চলের উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। এতে করে পর্যটকদের জন্য নতুন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে কর্মসংস্থান। শুধু কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার এবং তার কাজ শুরু হয়েছে। প্রতি বছরে এতে বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এই সকল স্থানে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পর্যটনশিল্পের সুফল পেতে হলে আমাদের দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখনো প্রচুর বিদেশি কাজ করে, যেখানে আমাদের দেশীয় লোকবলের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যটনবিষয়ক পড়ালেখা চালু হয়েছে, যা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন জনশক্তি তৈরিতে কাজ করছে তাদের ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি নির্ভরশীলতা কাটিয়ে দেশীয় জনশক্তি দিয়ে এই খাত পরিচালিত হবে।
পর্যটনশিল্প বিকাশের অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। তার পরও আশানুরূপ বিকাশ আমরা এই শিল্পে দেখতে পাই না। আশার খবর হচ্ছে, এখন প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ দেশীয় পর্যটক ঘুরতে যায়। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ। ২০০০ সালের দিকে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ। বিদেশি পর্যটকনির্ভরতা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ-সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার এবং পর্যটন ব্যয় সীমার মধ্যে থাকলে দেশের মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। এক হিসেবে বলা হয়, ১৬ কোটির বেশি মানুষের বাংলাদেশ গড়ে প্রতি বছরে ১০ শতাংশও যদি দেশ ঘুরে দেখে, তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তত্পরতা সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে পর্যটনের যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও নানা প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে আজকে আশার আলো ছড়াচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাসমূহের নৈমিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপার সম্ভাবনাময় আমাদের এই বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আদর্শ পর্যটননগরী। তাছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি বাংলাদেশকে আরো পরিচিত করে তুলছে বিশ্বের দরবারে। ২০১৮ সালের ওআইসির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন শহর-২০১৯ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। এই শহরের রয়েছে শত বছরের ইসলামিক ঐতিহ্য। ঢাকার ৪০০ বছরের ইসলামিক ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরতে এই স্বীকৃতি অনন্য ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে ঢাকা তথা সারা বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্ব ও মুসলিম দুনিয়ায় নতুন করে পরিচিতি লাভ করবে। পর্যটনের নতুন দিগন্ত সূচনা হবে এর ফলে। যা শুধু অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করবে না, সেই সঙ্গে বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরবে।
তবে বিগত কয়েক বছরের সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে ভালো করেছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের ২০১৯ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, আগামী ১০ বছরে পর্যটন খাতে দ্রুত বর্ধনশীল দেশের তালিকায় বাংলাদেশ জায়গা করে নিয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। এবং বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান হবে ৬.১ শতাংশ। সংস্থাটির ২০১৮ সালের রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, পর্যটনের সব সূচকে বাংলাদেশ বিগত ২০১১-২০১৭ সাল পর্যন্ত অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। এই রিপোর্টে দেখা যায়, সব সূচকে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৮তম। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যে বিশ্বে পর্যটকদের চাহিদা দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। আগামী দিনে বিশ্বের মোট পর্যটকের প্রায় ৭০ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়া অঞ্চলে। সেই দিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। যে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাছে তা আরো বেগবান করা গেলে এই খাতে আরো অর্থনৈতিক উন্নতি করা যাবে। পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বেকারত্বের হার কমে আসবে। আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, যাতে এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকে।
n লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
