তৃতীয় লিঙ্গের তিন প্রহরীর গল্প

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৪

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো আমাদের সমাজে যেভাবে অবহেলিত ও অপমানিত হয়, তা সভ্যমানুষ হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার। সমাজে আমরা শুধু তাদের তিরস্কারই করি, কিন্তু কখনো কোনো কাজের সুযোগ দেই না। কিন্তু এটা খুব সত্যি কথা সুযোগ পেলে এরা আমাদের মতোই কাজ করার যোগ্যতা রাখে

  ফায়জুন সিতু

 

মৃত্যুর পর তাদের দাফন কিংবা দাহ পর্যন্ত হয় না। অনেকই তাদের পছন্দ করেন না, ঘৃণার চোখে দেখেন। তাদের এই জীবন আচরণের জন্য আমরা যে, নিজেরাই দায়ী সেটা কি আমরা ভাবি? সমাজ-পরিবারবিচ্ছিন্ন জীবন তাদের। জীবনের একান্তে তারা আশা নিয়ে বাঁচেন। বলছি সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন নূরমিলা নীলা, সুমনা সকাল ও আলাউদ্দিন আঁখির গল্প।

সম্প্রতি সুমনা, নীলা ও আঁখি গণবিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। জীবনটা তাদের সহজ নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানে সামর্থ্য ও যোগ্যতা সত্ত্বেও কাজ না মিলা তাদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। বরং কোথাও চাকরি মিললে বিশ্বাস হতে চায় না। যেমনটি ঘটেছিল বাগেরহাটের নীলার ক্ষেত্রে। নীলা বললেন, প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায়নি, বারবার মনে হয়েছে সত্যিই চাকরিটা হবে তো? তারপর যখন চাকরির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি, তখন মনে হলো কর্মস্থলে নিজেকে যোগ্যপ্রমাণ করতে পারবো তো!

অবহেলা-ঘৃণা, উপেক্ষা, অনাদরে শিশু নীলা, আঁখি এবং সুমনার বেড়ে ওঠে হিজরা নাম নিয়ে আলাদা কোনো অছ্যুত গোত্রে।

নীলা এখনো ছেলে মানুষ রয়ে গেছে, সেই সাত বছর বয়স থেকে বাড়ি ছাড়া নীলা এখনো ভুলতে পারে না তার পরিবার। এই পরিবার তাকে সমাজের ভয়ে বের করে দিয়েছিল সেই ছোটবেলায়। তবু মায়ের জন্য মন কাঁদে। নীলার ভালোবাসাহীন জীবনে মা’কে এক পলক দেখতে ছুটে যান মায়ের কাছে। কখনো লোক লজ্জার ভয়ে মা দেখা করেন না, কিন্তু চাকরির বেতনের ২৫০০ টাকা মাকে প্রতি মাসে পাঠিয়ে দেন নীলা।

এমন যদি হতো, মা নীলার কাছে চলে আসতো, বেতন যত সামান্যই হোক, নিজে কষ্ট করে হলেও মাকে  সুখী করতো নীলা। নীলা ভালোবাসা চায়, চায় একটু স্নেহ ও আদর। কিন্তু সেই স্বপ্নটুকু দেখার সাহস নেই তার। আমি হিজরা, আমাকে সন্তান বলে পরিচয় দিলে মায়ের মান-ইজ্জত কি থাকবে? নীলার কষ্টটুকু বোঝার ক্ষমতা কি আমাদের আছে? হয়তো  নেই, যে ক্ষত কখনো শুকায় না, যে ক্ষতের ওপর উপর্যুপরি পুনর্ঘাত হতে থাকে, সে ক্ষত শুকায় না, বরং আরো গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। তৃতীয় লিঙ্গের আঁখি, নীলা এবং সুমনাদের দুঃখ বুঝতে পারা এতটা সহজ নয়।

নীলা কথা বলার সময় আঁখি আর সুমনার মুখে ফুটে ওঠে নির্লিপ্ততা। এটা তাদের স্বাভাবিক কষ্ট। এই কষ্টটি শুধু নীলার একার নয়, এই কষ্ট বেশির ভাগ তৃতীয় লিঙ্গের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। দুঃখ পেতে পেতে তাদের দুঃখের খরসে াতা নদীটি একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়, কিন্তু মনের সাথে মন মিলিয়ে দেখলে বিষাদের ছায়া ধরা পড়ে প্রত্যেকের চোখে-মুখে।

এক বিকেলে স্মৃতিসৌধে ঘুরতে গিয়ে আঁখির সাথে পরিচয় হয় টাঙ্গাইলের সুমনার। তারপর পরিচয় গড়ায় বন্ধুত্বে। কেমন লাগছে এখানে চাকরি পেয়ে, খুবই ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে- আমার কষ্টের দিনগুলো শেষ হতে যাচ্ছে বললেন আঁখি। 

সাভারের নবীনগরে আঁখির জন্ম। গান গাইতে আর নাচতে ভালোবাসেন। নীলা ও সুমনা নাচ, গান দুটোই জানেন। তাদের তিনজনেরই পছন্দের খাবার ভর্তা আর ভাত।

নীলা থাকেন পল্লী বিদ্যুত্ এলাকায়। আর আঁখি, সুমনা থাকেন নবীনগরে। তবে দূরত্ব থাকলে কি হবে। নীলার সাথে আঁখি আর সুমনার প্রতিনিয়তই ফোনে যোগাযোগ হয়। গল্পে, আড্ডায় ও নাচে-গানে দুঃখ ভাগ করে সময় কাটিয়ে দেন তারা।

তারা পৃথিবীর বুকে জন্মেছিল আর দশটি সাধারণ শিশুর মতো। শিশুটি বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিল পৃথিবীর আলো। এই পৃথিবীতে পিপড়েরা দলবেঁধে হেঁটে যায়, ব্যাঙ্গাচি পুকুরের জলে খেলা করে। হাতের দুই আঙুলে পিষে ফেলা যায় সারিবদ্ধ কতগুলো পিপড়ারকে অথবা শিশুটিই কোনো একসময় ঢিল মেরে যম হয়ে হানা দেয় ব্যাঙ্গের সংসারে। পৃথিবীর নির্মমতা এভাবেই মিশে যায় নীলা, আঁখি এবং সুমনাদের জীবনের সাথেও।

পুরুষরূপী শরীরে মনপ্রাণ একসময় লাস্যময়ীতে বদলে যায়, তাই নারীসুলভ সবকিছুই তাদের কাছে হয়ে ওঠে ভীষণ প্রিয়। বয়ঃসন্ধি থেকেই বঞ্চিত হন পারিবারিক সম্পত্তি থেকে, সমাজ তাড়িয়ে দেয় নির্মমভাবে এবং আশেপাশের মানুষ ঠাট্টা করে।

সুমনা বলেন, ‘কোনো কোনো মায়েরা তাদের ছোট বাচ্ছাকে ভয় দেখায়- ভাত খাও, নইলে হিজরা এসে নিয়ে যাবে। বাসে কেউ তার পাশের সিটটাতে বসতে চায় না, স্পর্শ বাঁচিয়ে চলে; যেন ছোঁয়া লাগলেই হিজরা হয়ে যাবে- বলেন, আমাগো কষ্ট লাগে না। হ্যাঁ, কষ্ট লাগে। কিন্তু তারা সেই কষ্টে চিত্কার করলেই দোষ। এই রক্ত-মাংসের শরীরে যে মনের উপস্থিতি, সেটা আমরা ভুলি কি করে। রাস্তায় অনেক সময় চোখে পড়ে, পরনে রঙ -বেরঙের শাড়ি আর চোখে যত্ন করে আঁকা মেঘ বর্ণের কাজল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। তারা হেলে-দুলে হাঁটে। আঁখির ভাষায় একে বলে রঙ-ঢং করে হাঁটা। তাদের কেউ ভালো চোখে দেখে না। বাড়ি থেকে আপনজনেরা তাড়িয়ে দেয়। সেই থেকে শুরু হয় তাদের ওপর জীবনের ভার। অনিরাপত্তা, অবহেলা, কষ্ট, উপেক্ষা নিয়ে এ জীবন, মুক্তির উপায় তো খুঁজবেই। ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন মরিয়া হয়ে শিকার খোঁজে আর তাকে বাঁচতেই হবে। জীবন ভয়ে হরিণ যেমন দৌড়ায় জীবন বাঁচানোর তাগিদে, তারাও তেমন কাজ খুঁজে জীবিকার প্রয়োজনে। দোকানে দোকানে চাঁদা সংগ্রহ করে। নাচ-গান, যৌনবৃত্তি বা কখনো কখনো কারো বাড়িতে নতুন শিশুর জন্ম হলে শিশুটির মঙ্গলকামনায় গান গেয়ে তারা চাঁদা চায়। মুখভঙ্গি কিংবা শারীরিক ভাষায় কেমন যেন শালীনতার অভাব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সমাজের বাকি মানুষের মতো সব কাজে নিয়োজিত থাকার  অধিকার তাদেরও রয়েছে। সেই সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই আমাদের এ উদ্যোগ। তৃতীয় লিঙ্গের নিরাপত্তাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর মধ্যে সমন্বয়কারী শিক্ষকদের একজন ইংরেজী বিভাগের সাকিনা আক্তার জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো আমাদের সমাজে যেভাবে অবহেলিত ও   অপমানিত হয়, তা সভ্যমানুষ হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার। সমাজে আমরা শুধু তাদের তিরস্কারই করি, কিন্তু কখনো কোনো কাজের সুযোগ দেই না। কিন্তু এটা খুব সত্যি কথা সুযোগ পেলে এরা আমাদের মতোই কাজ করার যোগ্যতা রাখে।

এখানে আসার পর থেকে তাদের ধারণা পাল্টাতে থাকে। তারাও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। আঁখি, নীলা এবং সুমনা বলেন, এখন আমরা আর নিজেকে ছোট মনে করি না, বরং একজন মানুষ মনে করি। এই নিয়োগকে দিনবদলের মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আঁখি, নীলা, সুমনাদের জীবন যেন আজন্ম পাপ। সেই পাপ যেন তৈরি করি আমরা নিজেরাই। যোগ্যতা অনুসারে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে দেয়া হোক সামাজিক এবং রাজনৈতিক অধিকার। ভালোবাসা আর আশ্রয়ে হোক মানবতার মুক্তি।

ছবি: মোঃ রকিবুল ইসলাম