আর নেওয়া যাচ্ছে না

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৯

  নুরুল মোমেন

 

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অসহায়ভাবে এদিক সেদিক তাকাচ্ছেন। বিভিন্ন অভিযোগ শুনছেন এদিক ওদিক তাকিয়ে। মন্ত্রীর বেদনার্ত মুখ দেখে বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা শান্ত হচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতাধরদের অসহায়ত্বের চাহনি আমাদের মতো আমজনতাকে আরও অসহায় করে তোলে। বলছিলাম     ঢাকার স্বনামধন্য একটি বালিকা বিদ্যালয়ের কথা। মেয়ে শিশুদের অভিভাবকদের স্বপ্নের বিদ্যালয় এটি। প্রতিষ্ঠানটি প্রায়ই আলোচনায় আসে। তবে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হলেও স্বপ্নবাজ কোনো শিক্ষার্থী তৈরি করে তারা আলোচনায় আসে না। কখনও আলোচনায় আসে স্কুলের শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হলে আবার কখনও আলোচনায় আসে শিক্ষকের নির্যাতন সইতে না পেরে ছাত্রী আত্মাহুতি দেওয়ায়।

 অরিত্রি অধিকারী, নবম শ্রেণিতে পড়তো ভিকারুননিসা নূন স্কুলে। তার পরীক্ষা চলছিল। শিক্ষকদের অভিযোগ, সে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে। তাই পরদিন তাকে তার অভিভাবক নিয়ে যেতে বলা হয় এবং স্কুলের উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের কাছে মেয়েটি ও তার অভিভাবক অপমানিত হয়। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কারণ এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন মেয়েটি অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে আর তার সহপাঠীরা আন্দোলনে নামে। প্রশাসনের টনক নড়ে। শিক্ষাবোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ছুটে আসেন। মন্ত্রী মহোদয়কে কাছে পেয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা যেসব অভিযোগ করছিলেন তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে শিক্ষকদের দুর্ব্যবহার, ভর্তি বাণিজ্য, কোচিং করতে বাধ্য করা, প্রাইভেট না পড়লে ফেল করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। অভিযোগগুলোর কোনোটিই নতুন না। দেশের স্বনামধন্য স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বহু আগে থেকেই শোনা যায়। তাই এই অভিযোগগুলোকে আর অনিয়ম বলে মনে হয় না। নিয়ম বলেই মনে হয়। সেই নিয়মের বলি হয় কোনো এক অরিত্রি। আমরা সাময়িক উত্তেজিত হই, নিজের ভিতরে জমতে থাকা ক্ষোভ উগড়ে দেই দু’দিন কি তিনদিন। তারপর আবার সেই পুরনো নিয়মে ফিরে আসি। সব ভুলে যাই।  

ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, অধ্যক্ষকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তে কেউ দোষী হবে, নতুন কোনো অধ্যক্ষ আসবেন কিন্তু তাতেই কি কোনো লাভ হবে? নতুন বছরে আমরা আবার তথাকথিত নামি-দামি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করতে লাইনে দাঁড়াব। ভিড় ঠেলে ভর্তি ফরম না পেলে ঘুষ দিয়ে ফরম সংগ্রহ করবো, সন্তানের মেধায় না কুলালে টাকা দিয়ে স্কুলে ভর্তি করবো, সকাল থেকে সন্ধ্যা এমনকি মাঝ রাত পর্যন্ত কোচিং-এ দৌড়াবো। কারণ আমাদের সামনে জিপিএ-৫ এর মুলা ঝুলানো আছে, তা আমাদের ধরতেই হবে। সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার সময় তার নাম আর দামের দিকে আমাদের যতটা নজর থাকে শিশু কতটা নিরাপদ থাকবে সেদিকে মোটেও নজর থাকে না। জিপিএ-৫ এর দিকে যতটা মনোযোগ থাকে তার এক ভাগও থাকে না, শিশু কি শিখছে সেদিকে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির শিক্ষক আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা হয়ে যাচ্ছে গিনিপিগ। শিক্ষার নামে যারা বাণিজ্য করছে তাদের প্রতিকার করা যে খুব   সহজ না, তা তো বুঝাই যায়। একটি শিশু তার শিক্ষালাভের প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও অনৈতিকতা দেখে বড় হচ্ছে। যে শিক্ষকদের সে আদর্শ হিসাবে দেখবে তাদের দেখছে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করছে, আর শিশুটির কাছ থেকে আমরা আশা করবো সে হবে মহান মানুষ। এমন প্রত্যাশা যে যুক্তিযুক্ত নয় তা কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে অরিত্রি অন্যায় করেছে, আত্মহত্যা করে আরও অন্যায় করেছে কিন্তু অরিত্রির শিক্ষার দায়ভার যাদের উপর ছিল তাদের কেউ কি এই দায় এড়াতে পারেন। যে কোনো উপায়ে বড় হবার বা ধনী হবার শিক্ষা থেকে সরে এসে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারলে অরিত্রিরা বাঁচলেও সুস্থভাবে বাঁচবে না। তাই আমাদের ভাববার সময় এসেছে শুধু জিপিএ-৫ প্রাপ্তিই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কিনা? তাই শিশুর জন্য দরকার নামি-দামি স্কুল নয় নিরাপদ স্কুল আর নামি-দামি শিক্ষক নয় মানবিক আর নৈতিক শিক্ষক।  

ছবি: সুজন মন্ডল